ঝড়ের দেড় বছর: সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় অবিচল ছিলেন রাষ্ট্রপতি

ঢাকা, মঙ্গলবার (24 ফেব্রুয়ারি): টানা দেড় বছর ধরে নানা চাপ, আন্দোলন ও অপসারণের চেষ্টার মধ্যেও তিনি সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে একচুল নড়েননি—এমনটাই জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। রাজধানীর বঙ্গভবন-এ দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “গত দেড় বছরে আমার ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, তা সহ্য করার ক্ষমতা অনেকের নেই। কিন্তু আমি ভেঙে পড়িনি।”

রাষ্ট্রপতি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টায় তাকে ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট ও সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তবে দৃঢ় অবস্থানের কারণে কোনো উদ্যোগই সফল হয়নি।


‘রক্ত ঝরলেও বঙ্গভবন ছাড়তাম না’

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ, মিছিল ও বঙ্গভবন অভিমুখে আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আমাকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে বহুবার। কিন্তু আমি বলেছি, আমার রক্ত ঝরে যাবে বঙ্গভবনে। তবুও আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব।”

২২ অক্টোবর ২০২৪-এর এক ঘেরাও কর্মসূচির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন সংগঠন ও প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে লোকজন জড়ো হয়েছিল। রাতারাতি এসব সংগঠনের উত্থান এবং অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন তিন স্তরের নিরাপত্তা দেয়। সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেয়। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ঘটনায় উদ্দেশ্যমূলক নাটকীয়তা তৈরি করে তা প্রচারের চেষ্টা করা হয়েছে।

সেই রাতকে তিনি “বিভীষিকাময়” হিসেবে উল্লেখ করেন। ফ্লাইওভার দিয়ে ঠেলাগাড়ি ও ভ্যানে করে লোকজন আনা হয়েছিল বলেও দাবি করেন। তার আশঙ্কা ছিল, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে লুটপাটের ঘটনা ঘটতে পারত। তবে সশস্ত্র বাহিনী দৃঢ় অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয় বলে জানান তিনি।


নাহিদ ইসলামের ফোন ও আন্দোলন ছত্রভঙ্গের চেষ্টা

রাষ্ট্রপতি জানান, রাত ১২টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করে জানান, ঘেরাওকারীরা তাদের লোক নয় এবং তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চলছে। পরে কিছু স্থানীয় ব্যক্তি এসে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে নেয়। তবে গভীর রাত পর্যন্ত ছোট ছোট দলে রাষ্ট্রপতির অপসারণ দাবিতে স্লোগান চলতে থাকে।


‘বিএনপি পাশে ছিল’

দুঃসময়ে কারা পাশে ছিলেন—এ প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিল। তারা সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়।

বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে তিনি বলেন, শুরুতে তার মনে কৌতূহল থাকলেও পরে তাকে আন্তরিক মনে হয়েছে। “আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল,”—বলেন রাষ্ট্রপতি।


অপসারণের উদ্যোগ ও রাজনৈতিক বিভাজন

রাষ্ট্রপতি দাবি করেন, গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয় এবং দুটি গ্রুপ তৈরি হয়। একটি পক্ষ তার অপসারণের পক্ষে, অন্যটি বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

তিনি বলেন, “যেকোনো মুহূর্তে মেজরিটি হয়ে গেলে আমাকে অপসারণ করা হতো। কিন্তু বিএনপি ও তাদের জোটের অবস্থানের কারণে উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়।”

রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পর্যায়ে ব্যর্থ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেও নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়।


সাবেক প্রধান বিচারপতিকে বসানোর ‘চক্রান্ত’ অভিযোগ

রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেন, অসাংবিধানিক উপায়ে এক সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তার স্থলাভিষিক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। সরকারের এক উপদেষ্টা ওই বিচারপতির সঙ্গে বৈঠকও করেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে সংশ্লিষ্ট বিচারপতি রাজি হননি এবং সাংবিধানিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগের সূত্রেই বিষয়টি তিনি জানতে পারেন।


সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থন

রাষ্ট্রপতি জানান, তিন বাহিনীর প্রধানরা তাকে সমর্থন দিয়েছেন। তারা বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পরাজয় মানে সশস্ত্র বাহিনীর পরাজয়। কোনো অসাংবিধানিক পদক্ষেপ তারা মেনে নেবেন না বলেও তাকে আশ্বস্ত করা হয়।

বঙ্গভবনের সামনে মব সৃষ্টির সময়ও সশস্ত্র বাহিনী একই অবস্থান নেয় বলে জানান তিনি।


ড. ইউনূসের সঙ্গে সমন্বয় ছিল না

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তিনি কোনো ফোন পাননি। নিজেও সাহায্য চাননি।

রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেন, প্রধান উপদেষ্টা সংবিধান অনুযায়ী বিদেশ সফরের পর তাকে অবহিত করেননি। ১৪-১৫ বার বিদেশ সফর করলেও একবারও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেননি বা লিখিত প্রতিবেদন দেননি বলে দাবি করেন তিনি।


১৩৩ অধ্যাদেশ ও সমন্বয়হীনতা

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সবগুলো প্রয়োজনীয় ছিল কি না, তা নিয়ে তার প্রশ্ন আছে। অনেক অধ্যাদেশের যৌক্তিকতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তির বিষয়েও তাকে জানানো হয়নি বলে দাবি করেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রীয় চুক্তি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা—এ কথা উল্লেখ করেন তিনি।


বিদেশ সফর আটকে দেওয়া ও আমন্ত্রণ বাতিল

রাষ্ট্রপতি বলেন, তার দুটি বিদেশ সফর আটকে দেওয়া হয়। একটি ছিল কসোভো সফর। এছাড়া কাতারের আমিরের আমন্ত্রণে একটি সামিটে যোগ দেওয়ার সুযোগও বাতিল করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠির খসড়া পাঠিয়ে তাকে ব্যস্ততার অজুহাতে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। তিনি ওই চিঠিতে প্রশ্ন তুলে পাল্টা চিঠি দেন এবং আচরণকে শিষ্টাচারবহির্ভূত বলে নিন্দা জানান।


হাইকমিশনগুলো থেকে ছবি নামানোর অভিযোগ

রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, এক উপদেষ্টার নির্দেশে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামিয়ে ফেলা হয়। বহু বছরের রেওয়াজ ভেঙে রাতারাতি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর তিনি জানতে পারেন।

এ ঘটনাকে তিনি অপসারণ প্রক্রিয়ার “প্রথম ধাপ” হিসেবে সন্দেহ করেছিলেন।


প্রেস উইং প্রত্যাহার

রাষ্ট্রপতি জানান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং অসন্তোষ প্রকাশ করে। পরে বঙ্গভবনের প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারিকে প্রত্যাহার করা হয়। এমনকি দীর্ঘদিনের দুই ফটোগ্রাফারকেও সরিয়ে নেওয়া হয়।

ফলে বঙ্গভবন থেকে কোনো প্রেস রিলিজ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না বলে জানান তিনি। জাতীয় দিবসের ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতির বাণী প্রকাশ বন্ধ ছিল বলেও দাবি করেন।


‘আমাকে আড়ালে রাখার চেষ্টা হয়েছে’

রাষ্ট্রপতির ভাষায়, “ওই সরকার চায়নি কোথাও আমার নাম আসুক। আমাকে অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করেছে।” দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও তাকে যেতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে সব চাপ ও অপমান সত্ত্বেও তিনি দায়িত্বে অবিচল ছিলেন বলে জানান রাষ্ট্রপতি। তার দাবি, তিনি শুধু একটি বিষয় মাথায় রেখেছেন—সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।


পরিশেষে, টানা দেড় বছরের টানাপোড়েন, রাজনৈতিক বিভাজন, অপসারণের অভিযোগ ও সমন্বয়হীনতার নানা ঘটনা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নিজেকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তার ভাষায়, “ঝড় গেছে, কিন্তু আমি নড়িনি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *