ছায়েম তৌহিদ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন?
বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-কে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তিনি দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান-কে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান—যা রাজনৈতিক মহলে বিশেষ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন সময়ের অপেক্ষা।
🗓️ শপথের সম্ভাব্য সময়সূচি
সূত্র জানায়, আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন।
বিকেলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। সংবিধান অনুযায়ী, মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি।
তাই প্রশ্ন জাগছে—রাষ্ট্রপতির আসনে কাকে দেখা যাবে?
🌾 জন্মভূমির আলোছায়া
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি, উত্তর বাংলার শান্ত-স্নিগ্ধ জনপদ ঠাকুরগাঁও-এ জন্ম নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শীতের কুয়াশা ভেদ করে যে সূর্য ওঠে, তার আলো যেমন কোমল অথচ দৃঢ়—তেমনি ছিল তাঁর শৈশবের ভিত।
গ্রামের মাটির গন্ধ, মানুষের সরলতা, সংগ্রামের শিক্ষা—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক মননশীল, সংযত এবং দায়িত্ববান মানুষ।
🎓 শিক্ষা ও বোধের নির্মাণ
তিনি পড়াশোনা করেন ঢাকা কলেজ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ অর্থনীতি বিষয়ে। ছাত্রজীবনেই তিনি বুঝেছিলেন—দেশ মানে শুধু মানচিত্র নয়, দেশ মানে মানুষের অধিকার, ন্যায় ও মর্যাদা।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল এক সাহসী তরুণের স্বপ্নদেখা পদক্ষেপ। তখনই রাজনীতির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
📚 শিক্ষকতা: আলোর প্রদীপ
বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি শিক্ষকতা করেন ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে। শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু অর্থনীতির পাঠ দিতেন না—দিতেন নৈতিকতার শিক্ষা, দিতেন দায়িত্ববোধের দীক্ষা।
তাঁর সহকর্মীরা বলেন, তিনি ছিলেন মৃদুভাষী, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং নীতিনিষ্ঠ। ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, আবার একজন অভিভাবকও।
🏛️ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার প্রথম অধ্যায়
১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর শাসনামলে তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনের ভেতরের কাঠামো, নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়া—সব তিনি কাছ থেকে দেখেন।
কিন্তু ক্ষমতার প্রলোভন তাঁকে গ্রাস করেনি। তিনি ফিরে যান শিক্ষকতার পেশায়—এ যেন ক্ষমতার চেয়ে নীতিকে বড় করে দেখার এক নিঃশব্দ ঘোষণা।
🗳️ রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ পথচলা
১৯৮৬ সালে পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা—দুটোরই সমন্বয় ঘটান তিনি।
🔷 দলের ভিত মজবুত করার কারিগর
২০০৯ সালে তিনি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১৬ সালে দলের নিয়মিত মহাসচিব নির্বাচিত হন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এই দায়িত্ব পালন করে দলের ইতিহাসে অন্যতম স্থায়ী সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
সংকট, মামলা, আন্দোলন, প্রতিকূলতা—সবকিছুর মধ্যেও তাঁর কণ্ঠ ছিল শান্ত, যুক্তিনির্ভর ও দৃঢ়।
🌿 সংগ্রাম, সততা ও চরিত্রের নির্মাণ
তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল ক্ষমতার গল্প নয়—এ এক দীর্ঘ ধৈর্যের কাব্য।
তিনি কখনও উত্তপ্ত ভাষায় বিভাজন তৈরি করেননি; বরং সংলাপ, যুক্তি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস রেখেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক দক্ষতা দেশের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
📖 এক মানুষের অন্তর্লোক: গল্পের ভেতরের গল্প
যদি তাঁকে গল্পের চরিত্রে কল্পনা করা হয়—তবে তিনি হবেন সেই মানুষ, যিনি ঝড়ের মধ্যেও ছাতা ধরেন অন্যের জন্য।
যিনি ক্ষমতার সিঁড়িতে উঠতে চান না, বরং দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নেন নীরবে।
এক তরুণ ছাত্র থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে রাজনীতিক, আর রাজনীতিক থেকে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি—এই যাত্রা কেবল পদোন্নতির নয়, এটি বিশ্বাসের বিবর্তন।
🇧🇩 রাষ্ট্রপতির আসনে—নতুন অধ্যায়?
রাষ্ট্রপতির পদ কেবল আনুষ্ঠানিক নয়; এটি সংবিধানের রক্ষক, রাষ্ট্রের ঐক্যের প্রতীক।
যদি সত্যিই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই আসনে বসেন—তবে তা হবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এক পরিণত অধ্যায়।
দেশ এখন অপেক্ষায়—
ঘোষণার, সিদ্ধান্তের, ইতিহাসের নতুন পৃষ্ঠার।
🌅 সময়ের দ্বার খুলছে
রাজনীতি কখনও শুধুই সংখ্যার খেলা নয়; এটি মানুষের আস্থা, স্মৃতি ও প্রত্যাশার সমষ্টি।
আজকের আলোচনার কেন্দ্রে থাকা এই নামটি কেবল একজন রাজনীতিকের নয়—এটি এক দীর্ঘ পথচলার প্রতীক।
রাষ্ট্রপতির আসনে কি বসছেন তিনি?
উত্তর সময়ই দেবে।
কিন্তু এটুকু নিশ্চিত—
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম ইতিমধ্যেই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।