স্বাস্থ্য ডেস্ক :
নিপাহ ভাইরাস একটি অত্যন্ত সংক্রামক ও প্রাণঘাতী রোগ। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে প্রায় প্রতি বছরই শীত মৌসুমে এ রোগের সংক্রমণ দেখা যায়। দ্রুত শনাক্তকরণ, সময়মতো চিকিৎসা এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা না থাকলে এ ভাইরাসে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা টিকা নেই। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
নিপাহ ভাইরাস কী এবং কীভাবে ছড়ায়
নিপাহ ভাইরাস মূলত বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। বিশেষ করে ফলখেকো বাদুড় এই ভাইরাসের প্রধান বাহক। বাদুড়ের লালা, মূত্র বা থুতু মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণ ঘটে। কাঁচা খেজুরের রস, বাদুড়ে খাওয়া আংশিক ফল, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ—এসবের মাধ্যমেও এ ভাইরাস ছড়াতে পারে।
এছাড়া আক্রান্ত রোগীর কাশি, হাঁচি, থুতু কিংবা শরীরের নিঃসৃত তরলের মাধ্যমেও অন্য মানুষের মধ্যে সংক্রমণ হতে পারে। তাই একজন রোগী থেকে অন্যজনের মধ্যে ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা খুবই বেশি।
নিপাহ ভাইরাস শনাক্তকরণ: যেসব পরীক্ষায় ধরা পড়ে
নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য আধুনিক ল্যাবরেটরিতে কয়েকটি বিশেষ পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
-
এলাইজা (ELISA) টেস্ট
-
পিসিআর (PCR) টেস্ট
-
সেল কালচার পরীক্ষা
এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে রক্ত, লালা বা শরীরের অন্যান্য নমুনা বিশ্লেষণ করে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়। উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর যত দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব হবে, রোগীকে বাঁচানোর সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে।
নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে সাধারণ জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—
-
জ্বর
-
মাথাব্যথা
-
শরীর ব্যথা
-
বমি বা বমি ভাব
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই রোগটি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তখন দেখা দিতে পারে—
-
শ্বাসকষ্ট
-
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
-
খিঁচুনি
-
মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)
এই পর্যায়ে রোগীর অবস্থা খুবই সংকটজনক হয়ে ওঠে।
চিকিৎসা: এখনো নেই নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ
নিপাহ ভাইরাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এখন পর্যন্ত এর কোনো কার্যকর ওষুধ বা টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। তাই রোগ শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে আইসিইউতে রাখতে হয়। চিকিৎসা মূলত রোগের লক্ষণ অনুযায়ী দেওয়া হয়। যেমন—
-
জ্বর কমানোর ওষুধ
-
শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন
-
খিঁচুনি হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে রোগীর জীবন রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
বেঁচে গেলেও থেকে যায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা বেঁচে যান, তাদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না। দেখা যায়—
-
স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়
-
কথা বলায় সমস্যা হয়
-
চলাফেরায় অক্ষমতা দেখা দেয়
-
কেউ কেউ আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান
এ কারণে নিপাহ ভাইরাসকে শুধু একটি সংক্রামক রোগ নয়, বরং একটি ভয়াবহ সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয় হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জরুরি
নিপাহ রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বাড়তি সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের মাধ্যমে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের যেসব সতর্কতা মানতে হবে—
-
মুখে মাস্ক পরতে হবে
-
হাতে গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে
-
সারা শরীর ঢেকে গাউন বা পিপিই পরতে হবে
-
রোগী দেখার পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে
-
রোগীর ব্যবহৃত কাপড় ও সামগ্রী জীবাণুমুক্ত না করে পুনরায় ব্যবহার করা যাবে না
রোগীর কফ ও থুতু যেখানে-সেখানে ফেলা যাবে না। এগুলো একটি নির্দিষ্ট পাত্রে রেখে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে।
নিপাহ প্রতিরোধে করণীয়: সচেতনতাই প্রধান অস্ত্র
শীত মৌসুমে গ্রামবাংলায় খেজুরের রস খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু এই রস থেকেই নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়।
যেসব বিষয়ে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে—
১. কাঁচা খেজুরের রস পান করা যাবে না
খেজুরের কাঁচা রস কোনোভাবেই পান করা উচিত নয়। পান করতে হলে ভালোভাবে টগবগ করে ফুটিয়ে নিতে হবে। তবে খেজুরের রস দিয়ে তৈরি গুড়, পায়েস বা পিঠা খাওয়া তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
২. রস সংগ্রহের হাঁড়ি ঢেকে রাখতে হবে
গাছ থেকে রস সংগ্রহের সময় হাঁড়ি বা পাত্র নেট, পলিথিন বা বাঁশের তৈরি ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, যাতে বাদুড় রসে মুখ দিতে না পারে।
৩. রস সংগ্রহকারীদের সতর্কতা
যারা রস সংগ্রহ করেন, তাদের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। কারণ হাঁড়ির আশপাশে বাদুড়ের লালা লেগে থাকতে পারে। রস সংগ্রহের পর অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।
৪. কাঁচা রস বিক্রি বন্ধ করতে হবে
খেজুরের রস বিক্রেতাদের কাঁচা রস বিক্রি থেকে বিরত থাকতে হবে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
৫. ফল ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে
সব ফল পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে। পাখি বা বাদুড়ে খাওয়া আংশিক ফল—যেমন আম, লিচু, জাম, কাঁঠাল, পেঁপে, পেয়ারা, বরই ইত্যাদি—না খাওয়াই নিরাপদ।
৬. নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস
হাতের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই খাবার আগে-পরে এবং বাইরে থেকে এসে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
৭. আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন
নিপাহ আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। রোগীর পরিচর্যার সময় অবশ্যই সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং পরে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
৮. আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধ বন্ধ
নিপাহ আক্রান্ত মাকে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে, যাতে শিশুর মধ্যে সংক্রমণ না ছড়ায়।
সচেতনতা বাড়ালেই রক্ষা সম্ভব
নিপাহ ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক না থাকলেও সচেতনতা ও সতর্কতার মাধ্যমে এ রোগ থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে রক্ষা করা সম্ভব। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ এবং রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই হতে পারে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে বড় উপায়।
নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে আজই সতর্ক হোন—নিজে বাঁচুন, অন্যকেও বাঁচান।