নিরাপদ সড়কের প্রশ্ন : কবে আসবে পরিবর্তন?

ছায়েম তৌহিদ

সকালটা ছিল একদম স্বাভাবিক। রোদ নরম, আকাশ পরিষ্কার। স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়ে বের হয়েছিল নয় বছরের রিফাত। আজ স্কুল ছুটি একটু আগে। মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছেলেকে বলে দিয়েছিলেন, “রাস্তা পার হওয়ার সময় সাবধানে যাবি।” রিফাত মাথা নেড়ে হাসি দিয়েছিল। কে জানত, সেটাই ছিল মায়ের সঙ্গে তার শেষ কথা।

গ্রামের সেই সরু পাকা রাস্তাটা আসলে কোনো মহাসড়ক নয়, তবু সারাদিন ভারী যান চলে। দুপুরের দিকে হঠাৎ করে একটা নছিমন বেপরোয়া গতিতে এসে রিফাতকে চাপা দেয়। চালকের কোনো লাইসেন্স নেই, গাড়ির কোনো ফিটনেস নেই। দুর্ঘটনার পর সে পালিয়ে যায়। রিফাত আর কখনো ঘরে ফেরে না।

এই গল্পটা শুধু রিফাতের নয়। বাংলাদেশে প্রতিদিন এমন অসংখ্য শিশুর গল্প লেখা হচ্ছে-যেগুলো শেষ হয় খুব তাড়াতাড়ি, খুব নির্মমভাবে।
নতুন প্রজন্মই একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তারাই দেশকে সামনে এগিয়ে নেবে, গড়ে তুলবে আগামী দিনের সমাজ। অথচ সেই প্রজন্ম আজ সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। সড়কের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, দায়িত্বহীনতা আর আইনের শাসনের অভাবে শিশুরা অল্প বয়সেই মৃত্যুর মুখে পড়ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো-এই মৃত্যুগুলো এখন আমাদের কাছে প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। খবরের কাগজে এক কোণে ছোট করে ছাপা হয়, সামাজিক মাধ্যমে দু-একদিন আলোচনা হয়, তারপর সব ভুলে যাই। কিন্তু সংখ্যা ভুলে যায় না। গত এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮টি শিশু মারা গেছে। এটি কোনো পরিসংখ্যানের খেলা নয়-এটি ১ হাজার ৮টি পরিবারের আজীবন কান্না। একটি জাতি হিসেবে এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে?

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৪ শতাংশ শিকার শিশু। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শহরের তুলনায় গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কে শিশুদের মৃত্যুর হার বেশি। কারণ গ্রামে সড়ক মানেই বসতবাড়ির সামনে দিয়ে চলে যাওয়া একটি পথ। সেখানে নেই গতি নিয়ন্ত্রণ, নেই ট্রাফিক পুলিশ, নেই কোনো সতর্কতা।

দুপুরবেলা স্কুল ছুটি হলে শিশুরা রাস্তায় নামে। কেউ বাড়ি ফেরে, কেউ খেলতে যায়। ঠিক তখনই বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, নছিমন-ভটভটি ছুটে চলে। অদক্ষ, অনেক সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের হাতে স্টিয়ারিং। এক মুহূর্তের ভুলে নিভে যায় একটি জীবন।
শহরের দৃশ্যও খুব আলাদা নয়। যে রাস্তায় যে গাড়ি চলার কথা না, সেখানে অনায়াসে তা চলছে। লাইসেন্স ছাড়াই মানুষ গাড়ি চালাচ্ছে। প্রশিক্ষণ ছাড়াই তরুণেরা মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামছে-তারুণ্যের উত্তেজনায় গতি যেন তাদের কাছে খেলনা। দুর্ঘটনা ঘটছে, মানুষ মরছে, শিশুরা পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দোষীরা বেশির ভাগ সময়ই রেহাই পেয়ে যায়। পরিবহনের মালিক, অযোগ্য চালক-সবাই কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যায়।
পরিবহনবিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন-আমাদের সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা শিশুবান্ধব নয়। উন্নত দেশগুলোতে শিশুদের ‘নাজুক সড়ক ব্যবহারকারী’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্কুলের আশপাশে গাড়ির গতি খুব কম রাখা হয়। রাস্তা পার করানোর জন্য থাকে প্রশিক্ষিত লোক। ফুটপাত থাকে নিরাপদ।

আমাদের দেশে কী হয়? পরিকল্পনা ছাড়াই মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠে স্কুল। নেই স্কুলবাস, নেই নিরাপদ ফুটপাত। শিশুকে নিজের দায়িত্বে, নিজের বুদ্ধিতে রাস্তা পার হতে হয়। প্রাথমিক বইয়ে সড়ক-সচেতনতার পাঠ থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ দেখা যায় না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়কে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছে অবৈধ তিন চাকার যান-অটোরিকশা, নছিমন, ভটভটি। শিশুদের পথচারী হিসেবে মৃত্যুর পেছনে এদের দায় সবচেয়ে বেশি। এসব গাড়ির চালকের লাইসেন্স নেই, গাড়ির ফিটনেস নেই, তবু তারা অলিগলি থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়ায়। কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের নির্লিপ্ততা আজ প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।
একটি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাণ নেয় না; একটি পরিবারের পুরো জীবন থামিয়ে দেয়। সন্তান হারানো মা-বাবার শূন্যতা কোনো ক্ষতিপূরণে পূরণ হয় না। সেই ঘরে আর আগের মতো হাসি ফেরে না।

সড়ক নিরাপদ করতে হলে শুধু আইন করলেই হবে না। দরকার কঠোর প্রয়োগ। স্কুল ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গতি নিয়ন্ত্রক বসাতে হবে। শিশুদের ব্যবহারিক ট্রাফিক শিক্ষা দিতে হবে। ঘাতক চালকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা আর কোনো রিফাতের গল্প শুনতে চাই না। আর কোনো মায়ের কোলে সন্তানের নিথর দেহ দেখতে চাই না। রাষ্ট্র ও সমাজকে বুঝতে হবে-সড়ক নিরাপদ না হলে উন্নয়নের সব গল্পই অর্থহীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *