বিনোদন ডেস্ক :
নেদারল্যান্ডসের মর্যাদাপূর্ণ রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (IFFR)-এ বড় সাফল্য পেল বাংলাদেশের সিনেমা ‘মাস্টার’। উৎসবের ‘বিগ স্ক্রিন কমপিটিশন’ বিভাগে শীর্ষ পুরস্কার জিতে নিয়েছে ছবিটি। শুক্রবার রাতে উৎসব কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কারের ঘোষণা দেয়।
বাংলাদেশি পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত পরিচালিত এই সিনেমাটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আরও ১১টি চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জয়ী হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সিনেমার জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন।
আনন্দে ভাসছে ‘মাস্টার’-এর পুরো টিম
পুরস্কার জয়ের খবরে উচ্ছ্বসিত সিনেমাটির পুরো টিম। অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন—
“আমরা বিগ স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড জিতেছি। আমাদের পরিচালক ও পুরো টিমকে অভিনন্দন। বাংলাদেশের জন্য আজ দারুণ একটি দিন।”
পুরস্কারটি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয় পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের হাতে। এই মুহূর্তটিকে তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন বলে উল্লেখ করেছেন।
পরিচালকের অনুভূতি: ‘স্বপ্নের মতো লাগছে’
পুরস্কার জয়ের পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত বলেন,
“এটা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের। আসলে এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এই ক্যাটাগরিতে যে সিনেমাগুলো ছিল, সবগুলোই খুব শক্তিশালী ও মানসম্মত। সেখানে শুধু নির্বাচিত হওয়াটাই আমাদের জন্য আনন্দের ছিল। আর সেই তালিকা থেকে পুরস্কার জয়—এটা সত্যিই স্বপ্নের মতো।”
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের গল্প ও বাস্তবতা তুলে ধরতে পারাটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
‘মাস্টার’ সিনেমার গল্প: ক্ষমতা, নৈতিকতা আর দ্বন্দ্ব
‘মাস্টার’ সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে একজন সাধারণ শিক্ষকের জীবনকে ঘিরে। সময়ের প্রয়োজনে এবং নানা পরিস্থিতির চাপে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কিন্তু ক্ষমতার আসনে বসার পরই শুরু হয় আসল সংকট।
যাঁরা নির্বাচনের সময় তাঁর পেছনে সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরে তাঁর কাছে অন্যায্য সুবিধা ও সাহায্য প্রত্যাশা করতে শুরু করেন। একদিকে তাঁদের প্রত্যাশা, অন্যদিকে নিজের বিবেক ও আদর্শ—এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে যান শিক্ষক।
তিনি বুঝতে পারেন, সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। আবার কারও অন্যায় দাবি মেনে নেওয়াও তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায় না। এই ভেতরের দ্বন্দ্ব, চাপ আর সিদ্ধান্তহীনতাই ধীরে ধীরে তাঁকে বদলে দেয়। সেই পরিবর্তনের গল্পই গভীরভাবে তুলে ধরেছে ‘মাস্টার’।
কেন জুরি বোর্ডের মন জয় করল ‘মাস্টার’?
পুরস্কার দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জুরি বোর্ড জানায়,
‘মাস্টার’ মূলত একজন মানুষের নৈতিকতা ধরে রাখার লড়াইয়ের গল্প। ছবিটি দেখিয়েছে, ক্ষমতা ও পুঁজিবাদের প্রলোভন কীভাবে ধীরে ধীরে একজন আদর্শবাদী মানুষকে বদলে দিতে পারে।
জুরি সদস্যদের মতে—
-
ছবির ভিজ্যুয়াল অত্যন্ত শক্তিশালী
-
লোকেশনগুলো প্রাণবন্ত ও বাস্তবসম্মত
-
পার্শ্বচরিত্রগুলো বিশ্বাসযোগ্য
-
প্রধান অভিনেতা অসাধারণ দক্ষতায় চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলেছেন
সব মিলিয়ে ছবিটি ক্ষমতার সর্বগ্রাসী প্রভাবকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরতে পেরেছে।
রটারড্যামে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার ও আন্তর্জাতিক প্রশংসা
গত ২ ফেব্রুয়ারি রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘মাস্টার’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। প্রিমিয়ারের পরপরই আন্তর্জাতিক দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেতে শুরু করে ছবিটি।
এই উৎসবে পরিচালক সুমিতের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সিনেমার তিন অভিনয়শিল্পী—
-
জাকিয়া বারী মম
-
আজমেরী হক বাঁধন
-
নাসিরউদ্দিন খান
তাঁদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ উৎসবজুড়ে ছবিটি নিয়ে আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তোলে।
চার্লি চ্যাপলিনের পরিবারের যুক্ত হওয়া: বাড়তি আলোচনায় ‘মাস্টার’
সিনেমাটির প্রিমিয়ারের আগেই এটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে আরেকটি কারণে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘কাওয়ানন ফিল্মস’ ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয়।
এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন—
-
কিংবদন্তি অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের নাতনি কারমেন চ্যাপলিন
-
প্রযোজক আশিম ভাল্লা
তাঁদের যুক্ত হওয়ায় ‘মাস্টার’ আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
অভিনয়ে যাঁরা
‘মাস্টার’ সিনেমায় আরও অভিনয় করেছেন—
-
ফজলুর রহমান বাবু
-
লুৎফর রহমান জর্জ
-
শরীফ সিরাজ
গল্প, চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও প্রযোজনার দায়িত্ব একাই সামলেছেন রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত, যা ছবিটিকে আরও ব্যক্তিগত ও গভীর করে তুলেছে।
রটারড্যাম উৎসব ও অন্য পুরস্কার
গত ২৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শেষ হচ্ছে আগামীকাল। এই উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার হিসেবে ধরা হয় ‘টাইগার অ্যাওয়ার্ড’।
এ বছর এই পুরস্কার জিতেছে দক্ষিণ আফ্রিকার সিনেমা ‘ভ্যারিয়েশনস অন আ থিম’। ছবিটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন ডেভন ডেলমার ও জেসন জেকবস।