নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে দেশজুড়ে ‘নিরাপত্তা উৎসবের’ প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভরসা ফেরাতে এবং একটি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করতে মাঠে নামছেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সেন্ট্রাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম।
তিন স্তরের নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা পরিকল্পনা
আইজিপি জানান, এবারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে, যাতে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে:
১. ভোটকেন্দ্রের সুরক্ষা (Static Force): দেশের মোট ৮৩ হাজার ৭৮৯টি ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে স্থায়ীভাবে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। তারা মূলত কেন্দ্রের ভেতরের শৃঙ্খলা রক্ষা করবেন। ২. মোবাইল টিম (Mobile Team): প্রতিটি এলাকায় পুলিশের বিশেষ টহল টিম সার্বক্ষণিক ঘুরতে থাকবে। কোথাও কোনো অসংগতি দেখলেই তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে। ৩. স্ট্রাইকিং ফোর্স (Striking Force): জরুরি পরিস্থিতি বা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রাখা হবে, যারা প্রয়োজনে দ্রুততম সময়ে অ্যাকশনে যাবে।
ভোটের মাঠে যখন ‘ড্রোন’ ও ‘বডি ক্যামেরা’
প্রথাগত নিরাপত্তার পাশাপাশি এবার প্রযুক্তির ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। আইজিপি বাহারুল আলম জানান:
-
সিসিটিভি ক্যামেরা: নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে দূর থেকেও প্রতিটি কেন্দ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
-
বডি ক্যামেরা: যে কেন্দ্রগুলো তুলনামূলক ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে দায়িত্বপালনকারী পুলিশ সদস্যরা ‘বডি ক্যামেরা’ ব্যবহার করবেন। এতে কর্মকর্তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং কেন্দ্রের পরিস্থিতি সরাসরি রেকর্ড হবে।
-
ড্রোন প্রযুক্তি: জেলা পুলিশ সুপাররা প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রোন ক্যামেরা ব্যবহার করে আকাশ থেকে নির্বাচনী এলাকার ওপর নজরদারি চালাবেন।
অন্যান্য বাহিনীর সাথে সমন্বয়
এবারের নির্বাচনে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীও বিশাল সংখ্যায় মাঠে থাকছে।
-
আনসার বাহিনী: নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে প্রায় ৬ লাখ আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
-
সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবি: এছাড়া সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং বিজিবি সদস্যরাও তাদের নির্ধারিত এলাকায় মোতায়েন থাকবেন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সকল বাহিনীর মধ্যে একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Control Room) চালু করা হয়েছে।
অস্ত্র উদ্ধার ও সহিংসতা প্রতিরোধ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আইজিপি জানান, এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ৯৯৫টি লাইসেন্সকৃত অস্ত্র থানায় জমা নেওয়া হয়েছে।
ভোটের পরিবেশ নিয়ে আইজিপি বলেন, “তফসিল ঘোষণার পর থেকে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা ঘটেছে। গত ১১ ডিসেম্বর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩১৭টি সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত হয়েছেন। প্রতিটি মৃত্যুই আমাদের জন্য বেদনার। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যেন ভোটের দিন একটি প্রাণহানিও না ঘটে।”
উপসংহার: লক্ষ্য যখন শান্তিপূর্ণ ভোট
সংবাদ সম্মেলনের শেষে আইজিপি বাহারুল আলম আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের লক্ষ্য একটাই—মানুষ যেন নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন এবং তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারেন। পুলিশের এই বিস্তৃত পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নির্বাচনে কারচুপি বা পেশিশক্তির ব্যবহার রুখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।