ছায়েম তৌহিদ
প্রায় দুই দশক পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, ২৯৭টি আসনের মধ্যে দলটি একাই পেয়েছে ২০৯টি। তাদের জোটের শরিকেরা পেয়েছে আরও ৩টি আসন। সব মিলিয়ে বিএনপি জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১২। আদালতের নির্দেশে স্থগিত থাকা আরও দুটি আসনে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসন যুক্ত হলে সংখ্যাটি আরও বাড়বে।
দলের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছে, চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন। এবারই প্রথম তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঢাকা ও বগুড়া—দুটি আসনেই জয়ী হয়েছেন।
২০০১ সালের পর সবচেয়ে বড় জয়
২০০১ সালে চারদলীয় জোটের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি একাই ১৯৩টি আসন পেয়েছিল, জোটসহ তাদের আসন ছিল ২১৬। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
এবারের ফলাফল সেই সাফল্যকেও ছাড়িয়ে গেছে। এককভাবে ২০৯ আসন পাওয়া বিএনপির ইতিহাসে অন্যতম সেরা ফলাফল। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার পর দলটি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে।
অভিজ্ঞতা ও নতুন মুখের সমন্বয়
নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে প্রবীণ ও নবীন—দুই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির যাঁরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তাঁরা সবাই জয়ী হয়েছেন। তাঁদের অনেকেরই অতীতে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
একই সঙ্গে তরুণ নেতারাও সংসদে জায়গা করে নিয়েছেন। এতে দলীয় নেতৃত্বে প্রজন্মগত ভারসাম্য তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এবার নির্বাচিতদের মধ্যে ছয়জন নারী সদস্য রয়েছেন, যা অন্যান্য বড় দলের তুলনায় বেশি। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চারজন প্রার্থীও বিএনপির টিকিটে জয়ী হয়েছেন। ফলে সংসদে বৈচিত্র্য বেড়েছে।
জোট রাজনীতি ও শরিকদের ভূমিকা
বিএনপির জোটে থাকা দলগুলোর মধ্যেও কয়েকজন আলোচিত নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন:
জোনায়েদ সাকি
আন্দালিভ রহমান পার্থ
নুরুল হক নুর
জোটের এই অংশগ্রহণ সংসদে বহুমাত্রিক আলোচনা ও বিতর্কে ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গণভোটের ফল: সংস্কারের দায় নতুন সরকারের
এই নির্বাচনের সঙ্গে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন প্রশ্নে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে ৪ কোটির বেশি, আর ‘না’ ভোট প্রায় আড়াই কোটির কাছাকাছি।
ফলে নতুন সরকারকে এখন রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। তবে কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে—সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই। গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
বিচার প্রক্রিয়া ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণহানির ঘটনার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা—দুটিই নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
শক্তিশালী বিরোধী দল পাচ্ছে সংসদ
ত্রয়োদশ সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট। তারা পেয়েছে ৭৭টি আসন। ১৯৯৬ সালের পর এবারই সংসদে তুলনামূলক বড় বিরোধী দল দেখা যাচ্ছে।
অতীতে কয়েকটি সংসদে বিরোধী দলের আসনসংখ্যা ৩০-এর কম ছিল। ২০০৮ সালে বিএনপি মাত্র ৩০টি আসন নিয়ে বিরোধী দলে ছিল। পরবর্তী বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতে বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা ছিল দুর্বল। এবার সে চিত্র বদলেছে।
আট জেলায় বিএনপির শূন্যতা
ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আটটি জেলায় বিএনপি কোনো আসন পায়নি। এসব জেলায় মোট আসনসংখ্যা ৩০। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দলটি প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি সাংগঠনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত হতে পারে। ভবিষ্যতে দলকে এ অঞ্চলগুলোতে সংগঠন শক্তিশালী করতে হবে।
ঢাকায় ভাঙল পুরোনো ধারা
রাজধানী ঢাকায় মোট ১৬টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ৮টি। বাকি আসনগুলোর বেশির ভাগ গেছে জামায়াতের দখলে।
১৯৯১ সাল থেকে যে দল সরকার গঠন করেছে, তারা প্রায় একচেটিয়াভাবে ঢাকার আসনগুলো জিতেছে। এবার সেই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে রাজধানীতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।
সামনে সুযোগ, পাশাপাশি সতর্কবার্তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে, তেমনি আত্মতুষ্টির ঝুঁকিও বাড়ায়। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকায় জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
নতুন সরকারকে এখন অর্থনীতি, সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামাল দিতে হবে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ থাকা দলগুলোর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
পরিশেষে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় খুলেছে। নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ও নতুন প্রজন্মের সমন্বয়ে তারা সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
তবে বড় জয় মানেই বড় দায়িত্ব। সংস্কার বাস্তবায়ন, বিচারপ্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় কতটা সফল হবে বিএনপি, সেটিই এখন দেখার বিষয়।