সৌদিতে প্রবাসীদের মৃত্যুদণ্ড: ‘ভাষা বোঝেন না, আইনজীবী পান না, লাশও ফেরে না’ হাড লাইনটা পরিবর্তন করে দেন

সৌদি আরবে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা, যার মধ্যে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশিও রয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৫৯ বিদেশি নাগরিকের এ সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর করা হয়েছে। বিশেষ করে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রদান, বিদেশি আসামিদের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নির্যাতনের অভিযোগ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন থেকে নেওয়া

গত বছরের মে মাসের কোনো একদিন। সৌদি আরবে এক ইথিওপীয় বন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এর আগে দেশে থাকা মাকে ফোন করে তিনি বলেছিলেন, পরদিন সকালে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে। সেদিনই হবে তাঁর শেষ নিশ্বাস। কথাটা শুনেই শুরু হয় মায়ের ‘গগনবিদারী কান্না’।

ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়। ওই ইথিওপীয়র মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়; কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ গেলেও লাশ পরিবারের হাতে আসেনি। এদিকে ছেলেকে শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষা করে করে মায়ের মধ্যে তীব্র মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়; শেষে তাঁকে ভর্তি করতে হয় হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগে।

ঘটনাটি লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে জানিয়েছিলেন ইথিওপীয় সম্প্রদায়ের একজন সদস্য। তাঁর নিজের ভাইও সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ওরা (সৌদির শাসকেরা) শুধু আমাদের ভাইদের মারছে না, আমাদেরও মারছে।’

উল্লেখ্য, সৌদি আরবের খামিস মুশাইত কারাগারেই এখন মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে বন্দী আছেন ৫৮ ইথিওপীয়।

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের হিসাব খুললে বিদেশিদের সংখ্যা পড়বে চোখে পড়ার মতো। দেশটির মোট ৩ কোটি ৫৩ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১ কোটি ৫৭ লাখের মতো মানুষ বিদেশি। অথচ ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত শুধু মাদক অপরাধেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ৫৯৭ জনের; তাঁদের প্রায় ৭৫ শতাংশই প্রবাসী।

হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া ইথিওপীয় বন্দীর ঘটনাটি কোনো ব্যতিক্রম নয়। সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের হিসাব খুললে বিদেশিদের সংখ্যা পড়বে চোখে পড়ার মতো। দেশটির মোট ৩ কোটি ৫৩ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১ কোটি ৫৭ লাখের মতো মানুষ বিদেশি/প্রবাসী। অথচ ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত শুধু মাদক অপরাধেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ৫৯৭ জনের; তাঁদের প্রায় ৭৫ শতাংশই বিদেশি (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য)।

বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইএসওএইচআরের তথ্য, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি–জুন) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে ৫৯ জন (প্রায় ৫৪ শতাংশ) বিদেশি। একই সময়ে মাদক অপরাধে কার্যকর করা ৭১টি মৃত্যুদণ্ডের ৪৯টি বিদেশির।

কোন দেশের কতজন

এই হিসাবে চোখ রাখলে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গত দশকে শুধু মাদক অপরাধে ১৫০ জন সৌদি নাগরিকের পাশাপাশি যাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ১৫৫ জন পাকিস্তানি, ৬৬ জন সিরীয়, ৫০ জন জর্ডানি, ৩৯ জন ইয়েমেনি, ৩৩ জন মিসরীয়, ৩২ জন নাইজেরীয়, ২২ জন সোমালীয় ও ১৩ জন ইথিওপীয়।

এ ছাড়া ইরান, আফগানিস্তান, চাদ, বাহরাইন, লেবানন, সুদান, তুরস্ক, ভারত ও ফিলিস্তিনের নাগরিকদেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে পাকিস্তানি নাগরিকের সংখ্যা সৌদি নাগরিকের সংখ্যাও ছাড়িয়ে গেছে।

তবে এ হিসাবের একটি সীমা আছে, যা অ্যামনেস্টি স্বীকার করেছে। তাদের বিশ্লেষণ শুধু সৌদি কর্তৃপক্ষ সরকারি সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে যেসব মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা প্রকাশ করেছে, সেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। গ্রেপ্তার, তদন্ত, বিচার ও সাজার প্রতিটি ধাপে বৈষম্য ঘটছে কি না, সে তথ্য এতে ধরা পড়ে না। অপরাধের ঘটনা, গ্রেপ্তার, অভিযোগ বা সাজার সরকারি পরিসংখ্যানও সংস্থাটির হাতে নেই। সে কারণে অ্যামনেস্টি বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য নিয়ে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তুলেছে।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

বিচারের আগেই শুরু হয় ঝুঁকি

এই প্রবাসীদের বিপন্নতা শুরু হয় বিচারের অনেক আগে, দেশ ছাড়ার সময় থেকেই। সৌদি আরবের মোট কর্মী বাহিনীর প্রায় ৭৭ শতাংশ অভিবাসী শ্রমিক। অ্যামনেস্টির বিশ্লেষণে, তাঁদের অসুবিধা শুরু হয় নিজ দেশে, প্রতারণামূলক নিয়োগপদ্ধতিতে; সৌদি আরবে এসে তা ধরে রাখে কাফালা বা স্পনসরশিপ ব্যবস্থা।

কাফালা এমন এক সীমাবদ্ধ ও শোষণমূলক অভিবাসন ব্যবস্থা, যা আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর বিশেষভাবে নেতিবাচক প্রভাব বা চাপ ফেলে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) নির্দেশিকা অনুযায়ী, হুমকি, বলপ্রয়োগ, জবরদস্তি বা প্রতারণার মাধ্যমে কাউকে শোষণের উদ্দেশ্যে নিয়োগ, পরিবহন বা আশ্রয় দেওয়া মানব পাচারের সংজ্ঞায় পড়ে। এই শোষণের মধ্যে যেমন জোরপূর্বক শ্রম আছে, তেমনি আছে অবৈধ কাজে বাধ্য করাও।

আইওএম সৌদিপ্রবাসীদের ঝুঁকির কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে অনিয়মিত অভিবাসন; গৃহকর্ম, সমুদ্রে কাজ বা অনানুষ্ঠানিক খাতের মতো চোখের আড়ালের কাজ; নিয়োগকর্তার অনুচিত নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগে দুর্নীতি, তৃতীয় পক্ষের দালালের ওপর নির্ভরতা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় ফাঁক অন্যতম।

সৌদি গিয়ে কোনো আইনি জটিলতা বা অপরাধে জড়িয়ে পড়লে, নিজেদের সহায়-সম্বল ও শিক্ষার অভাবে প্রবাসীরা ভালো কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না বা সঠিকভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারেন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগও কমে যায়। এতে ন্যায্য বিচারের অধিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ঝুঁকি শুধু তত্ত্বের কথা নয়। অ্যামনেস্টির নথিবদ্ধ মামলাগুলোর দুটিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বলেছেন, তাঁদের জোর করে নিষিদ্ধ মাদক বহন করানো হয়েছিল; কিন্তু আদালত সেই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেননি, মেনেও নেননি। সংস্থাটির নথিবদ্ধ তথ্য বলছে, সৌদি আরবে অভিবাসী শ্রমিকেরা নিয়োগ-দালালদের হাতে প্রতারিত হয়েছেন, অতিরিক্ত ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং মজুরি চুরির শিকার হয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে তা সম্ভবত শ্রম শোষণের উদ্দেশ্যে মানব পাচারের শামিল।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডের প্রভাব বিদেশি নাগরিকদের ওপর অসমভাবে পড়ে। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর ওপর এ অসম প্রভাব বন্ধের আহ্বান তাঁরা জানিয়েছেন। কারণ, বিচার ও আপিলের সময় কার্যকর আইনি সুরক্ষা জোগাড় করা এসব মানুষের পক্ষে প্রায়ই সম্ভব হয় না।

আবার যখন কেউ একই সঙ্গে একাধিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হন, তখন ওই সব সমস্যার একটি অন্যটিকে আরও তীব্র বা জোরালো করে তোলে। যেমন একজন শুধু অভিবাসী হওয়ার কারণেই বিভিন্ন অসুবিধায় পড়তে পারেন। কিন্তু তিনি যদি একই সঙ্গে কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতিসত্তার হন এবং নারী (লিঙ্গ) হন, তাহলে তাঁর জন্য আইনি সহায়তা পাওয়া, কাজের জায়গায় অধিকার আদায় করা বা বৈষম্য এড়ানো দ্বিগুণ বা তিন গুণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এখানে একটি অসুবিধা অন্য অসুবিধাটিকে হালকা না করে বরং বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ
সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ

আদালতে একা, ভাষা না জানা

এ বিপন্নতা আদালতে কেমন চেহারা নেয়, তা বুঝতে ইএসওএইচআর ও জেপিপির (জাস্টিস প্রজেক্ট পাকিস্তান) সহায়তায় মিসর, ইথিওপিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান ও সোমালিয়ার ২৫ বিদেশির মামলা নথিবদ্ধ করেছে অ্যামনেস্টি। তাঁরা সবাই মাদক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত; কেউ এখন মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায়, কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে।

গ্রেপ্তার হওয়া থেকে রায় পর্যন্ত এবং কারও ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পরও সৌদি বিচারব্যবস্থার ভেতর দিয়ে সংশ্লিষ্ট বন্দী ও তাঁদের পরিবারগুলো কীভাবে পথ চলেছে, সেটা খতিয়ে দেখেছে অ্যামনেস্টি। সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে ১৩ জনের পরিবার, ৪ জনের নিজ সম্প্রদায়ভুক্ত সদস্য ও ১ জন কনস্যুলার কর্মকর্তার। আরও ১৫ জনের আদালতের নথিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

পর্যালোচনার ফলাফল হলো, কম পড়াশোনা, ভাষাজ্ঞান আর টাকার অভাব থাকার কারণে এসব মানুষের দ্বিগুণ ক্ষতি হচ্ছে। প্রথমত, অভিবাসনের সময় ক্ষতি। টাকাপয়সা কম থাকায় এবং নিজের অধিকার বা নিয়মকানুন ভালোভাবে না বোঝায় সৌদি আরবে যাওয়ার শুরুতেই তাঁরা দালালদের প্রতারণা বা শোষণের শিকার হচ্ছেন।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted