এলপিজির বাজারে নৈরাজ্য, ভোক্তার স্বার্থ দেখবে কে?

সরকারি উদ্যোগে আমদানি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি

দেশের এলপিজি বাজারে অস্থিরতা দিন দিন বাড়ছে। এক মাসের ব্যবধানে দুই দফা দাম বাড়লেও বাজারে সরবরাহের সংকট কাটেনি। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। নতুন করে দাম বাড়ানোর পরও নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়লেও বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সম্প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়েছে। এর আগে ৪ অক্টোবর দাম বাড়ানো হয়েছিল ২১২ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে মোট ৪৩৫ টাকা। দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। তাঁদের অধিকাংশই রান্নার কাজে এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। শহরের পাশাপাশি গ্রামের অনেক পরিবারও এখন এলপিজি ব্যবহার করছে। ফলে দাম বাড়ার সরাসরি চাপ পড়ছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।

এলপিজির দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। বিইআরসির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, ভোক্তাদের দুর্ভোগ ততটা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। দাম নির্ধারণের শুনানির পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন মূল্য ঘোষণা করা হয়েছে। এত দ্রুত কীভাবে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত যাচাই ও মূল্যায়ন করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভোক্তার স্বার্থ উপেক্ষা করে শুধু ব্যবসায়ীদের সুবিধা বিবেচনা করা হলে এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।

দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। মানুষের আয় বাড়ছে না, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি পরিবারগুলোর ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। তবে ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির দাম বেশি। ফলে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দেশের বাজারের অস্থিরতাকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের এলপিজি বাজারের বড় দুর্বলতা হলো আমদানিতে বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। দেশের মোট চাহিদার মাত্র ১ শতাংশ সরকারি খাত থেকে সরবরাহ করা হয়। বাকি ৯৯ শতাংশ আসে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। আবার কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত। ফলে প্রতিযোগিতার সুযোগ কমে যাচ্ছে। অতীতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে সরাসরি উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা করা জরুরি। সরকারি আমদানি বাড়লে বাজারে সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরি হবে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া প্রভাব কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি আমদানি, মজুত, পরিবহন ও বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। কৃত্রিম সংকট তৈরি, অতিরিক্ত দাম আদায় ও বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এলপিজি এখন আর বিলাসী পণ্য নয়; এটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জ্বালানি। তাই এই বাজারকে পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সরকারের দায়িত্ব শুধু দাম নির্ধারণ করা নয়, নির্ধারিত দামে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করাও। ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে হলে বিপিসির মাধ্যমে এলপিজি আমদানি, বাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। এখনই উদ্যোগ না নিলে এলপিজির এই অস্থির বাজারের বোঝা আরও বাড়বে সাধারণ মানুষের কাঁধে।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted