এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, ২০২৭ সালে ৪০ কার্গোর মধ্যে ২৬টি দেবে কাতার

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ, মার্চ পর্যন্ত আমদানি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে সরকার; ঘাটতি মেটাতে বাড়তি দামে গ্যাস কেনার চাপ
ডেস্ক রিপোর্ট
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৭ সালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ। আগামী বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ ৪০টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কাতারএনার্জি। অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি মোট কার্গোর ৬৫ শতাংশ সরবরাহ করবে।
তবে অন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আগামী বছর কতটুকু গ্যাস পাওয়া যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ কারণে পুরো বছরের আমদানি পরিকল্পনা চূড়ান্ত না করে আপাতত আগামী মার্চ পর্যন্ত এলএনজি আমদানির সূচি তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পেট্রোবাংলাকে মার্চ পর্যন্ত সরবরাহ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সময়ে বাকি মাসগুলোর আমদানি পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হলে এ পথে জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আপাতত সীমিত সময়ের জন্য আমদানি সূচি তৈরি করা হচ্ছে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হলে নতুন করে কার্গো সংগ্রহের সুযোগ থাকবে।
১২৮ কার্গোর মধ্যে নিশ্চিত হয়েছে ৭১টি
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালে বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় এসব কার্গো পাওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তির সব কার্গোর সরবরাহ এখনো নিশ্চিত হয়নি। মোট ১২৮টি চুক্তিবদ্ধ কার্গোর মধ্যে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ৭১টির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। বাকি কার্গোগুলোর বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কাতারের সরবরাহ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী বছরের জন্য কাতারএনার্জি ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ মোট ৪০টি কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
কাতারএনার্জির সহযোগী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি ২৪টি কার্গোর বিপরীতে ১৮টি সরবরাহের প্রত্যাশা জানিয়েছে। অন্যদিকে কাতারএনার্জি নিজে ১৬টি কার্গোর মধ্যে আটটি সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছে।
দুই প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে কাতার থেকে ২০২৭ সালে মোট ৪৪টি কার্গো পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। তবে সব কার্গোর সরবরাহ এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি।
ওমানের সরবরাহ নিয়ে জটিলতা
এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওকিউ ট্রেডিংয়ের (ওকিউটি) সঙ্গে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের ৩২টি কার্গো সরবরাহের চুক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি কোনো কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত করেনি।
ওকিউটি ১৬টি কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এ প্রস্তাবের সঙ্গে মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের শর্তও জুড়ে দিয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চুক্তিতে ব্রেন্ট সূচকভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ওকিউটি জাপান-কোরিয়া মার্কার বা জেকেএম সূচকের ভিত্তিতে এলএনজির দাম নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে।
এ প্রস্তাবে রাজি হয়নি পেট্রোবাংলা। সংস্থাটি ওমানের প্রতিষ্ঠানটিকে আগের চুক্তির শর্ত অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম নির্ধারণে বিভিন্ন সূচক ব্যবহৃত হয়। কোন সূচকের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হবে, তার ওপর আমদানির ব্যয় অনেকটাই নির্ভর করে। ফলে মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য থাকলে সরবরাহ নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ওমানের প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানি পরিকল্পনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স থেকেও আসবে এলএনজি
কাতার ও ওমান ছাড়াও কয়েকটি দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এলএনজি আমদানির চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও আগামী বছর গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ ২০২৭ সালে ছয়টি এলএনজি কার্গো সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফ্রান্সের টোটালএনার্জিসের কাছ থেকে পাওয়ার কথা ১২টি কার্গো।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এক্সেলেরেট গ্যাসের সঙ্গে ১৪টি কার্গো সরবরাহের চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে নয়টি কার্গোর সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে।
তবে সব সরবরাহকারীর কাছ থেকে নির্ধারিত সময়ে গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনে এই প্রণালি ব্যবহৃত হয়।
বিশেষ করে কাতার থেকে এলএনজি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এ নৌপথের গুরুত্ব অনেক। ফলে এখানে সংঘাত, নিরাপত্তাঝুঁকি বা জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো সরাসরি প্রভাবিত হয়।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাই থাকে না, পরিবহন ব্যয় ও বিমা খরচও বেড়ে যেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে—এমন প্রত্যাশা থেকে সরকার আপাতত মার্চ পর্যন্ত আমদানি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে গ্যাস
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্ধারিত পরিমাণ এলএনজি না পাওয়ায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। স্পট মার্কেট হলো এমন একটি বাজার, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে তাৎক্ষণিক বা স্বল্পমেয়াদি ভিত্তিতে পণ্য কেনাবেচা হয়।
এই বাজারে এলএনজির দাম আন্তর্জাতিক চাহিদা, সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় অনেক সময় বেশি দামে গ্যাস কিনতে হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রয়োজন মেটাতে বাড়তি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে সরকারের আমদানি ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ভর্তুকির চাপ।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি খাতে ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গ্যাসের সরবরাহ ও দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা দেশের জ্বালানি খাতের পাশাপাশি সরকারি বাজেটের ওপরও বড় চাপ তৈরি করছে।
আমদানি পরিকল্পনায় সতর্ক সরকার
জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার একদিকে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে, অন্যদিকে বাড়তি দামে গ্যাস কেনার আর্থিক চাপও সামলাতে হচ্ছে।
পুরো বছরের আমদানি পরিকল্পনা একসঙ্গে চূড়ান্ত করলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে মার্চ পর্যন্ত সরবরাহ সূচি তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাকি কার্গোগুলোর সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত এলএনজি কেনার সুযোগ থাকবে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হতে পারে।
বাংলাদেশের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালি জ্বালানির চাহিদা মেটাতে এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৭ সালে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে আমদানি পরিকল্পনা পুনর্নির্ধারণ করবে পেট্রোবাংলা।
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)