খেলা, প্রেম আর ক্ষমতার দম্ভ নিয়ে অনুরাগের ‘মুক্কাবাজ’

আনুরাগ কশ্যপ মানেই ভিন্ন স্বাদ। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে বিকল্প সিনেমায় নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। শুধু ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ দিয়েই ভারতীয় চলচ্চিত্রে নতুন এক মাইলফলক তৈরি করেছেন অনুরাগ। ভারতীয় চলচ্চিত্রে নতুন ভাষা তৈরি করা এই নির্মাতার আন্ডাররেটেড একটি সৃষ্টির নাম ‘মুক্কাবাজ’।

২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মুক্কাবাজ’–এ বক্সিংকে আশ্রয় করে তুলে ধরেছে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নির্মম এক আখ্যান। তবে ভিন্ন এক লেন্সে কেউ চাইলে চলচ্চিত্রকে প্রেমকাহিনিও বলতে পারেন।

এই চলচ্চিত্রে উত্তর প্রদেশের এক ছোট্ট শহর থেকে উঠে আসা বক্সার শ্রবণ সিংকে রিংয়ের প্রতিপক্ষের পাশাপাশি লড়াই করতে হয় আরও অনেকগুলো শক্তিশালী সামাজিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। জাতিগত বৈষম্য, দুর্নীতি আর সমাজের পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে শ্রবণের এই লড়াইটা মোটেই সহজ হয় না। এই লড়াইয়ের জন্য অনেক ত্যাগও স্বীকার করতে হয় শ্রবণকে।

এই চলচ্চিত্রে শ্রবণ সিং চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভিনিত কুমার সিং। এক সাক্ষাৎকারে ভিনিত বলেছেন, চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য এবং বাস্তবসম্মতরূপে সাজাতে তিনি সবকিছু ছেড়ে দুই বছরের বেশি সময় ধরে বক্সিং শিখেছেন। এমনকি বক্সিং শিখতে মারাত্মক চোটের ঝুঁকিতেও পড়েছিলেন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই নিজের প্রস্তুতি শেষ করেন এবং ‘মুক্কাবাজ’–এ শ্রবণ চরিত্রে নিজেকে উজাড় করে দেন।

বক্সিংয়ের পাশাপাশি এই ছবিটি অসাধারণ এক প্রেম উপাখ্যানও বটে। ছবিতে কোচ, স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও স্টেট বক্সিং ফেডারেশনের প্রধান ভগবান দাস মিশ্রর (এই চরিত্রে অভিনয় করেন জিমি শেরগিল) অধীনে অনুশীলন করেন শ্রবণ। কিন্তু বক্সিং অনুশীলন করানোর পরিবর্তে ভগবান দাস শ্রবণকে দিয়ে ঘরের কাজই বেশি করান। এর মধ্যে ভগবান দাসের ভাতিজি সুনয়নার (এই চরিত্রে অভিনয় করেন নবাগত জয়া হোসাইন) প্রেম হয় শ্রবণের। সুনয়না আবার মূক-বধিরও বটে। এই প্রেমই শ্রবণকে আরও দৃঢ় করে তোলে। কিন্তু এই প্রেমের জন্য তাঁকে মূল্য দিতে হয় রক্ত, ঘাম আর চোখের জলে।

সুনয়নার প্রতি শ্রবণের ভালোবাসাই এই ছবিতে মূল দ্বন্দ্বটা তৈরি করে। ভগবান দাস চেষ্টা করেন শ্রবণের ক্যারিয়ার শেষ করে তাঁকে ধ্বংস করে দিতে। কিন্তু আরেক বক্সিং কোচ সঞ্জয় কুমারের (এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন রবি কিষান) সহায়তায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন শ্রবণ। কিন্তু হার মানতে নারাজ ছিলেন ভগবান দাসও। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই দুজনের মধ্যে জমে ওঠা দ্বন্দ্ব ছিল এই চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক।

অনুরাগ কশ্যপের এই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি এর বাস্তবধর্মিতা। রিংয়ের ভেতরে–বাইরে দুই জায়গাতেই অনুরাগ চেষ্টা করেছেন চলচ্চিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে। বক্সিং রিংয়ের ভেতরের দ্বৈরথ হোক কিংবা বাইরের সমাজে নোংরা রাজনীতি—সবকিছুতেই ছিল বাস্তবতার ছোঁয়া।

চলচ্চিত্রটি দেখার সময় কখনোই মনে হয়নি বানানো গল্প দেখানো হচ্ছে। প্রতিটি দৃশ্য মনে হচ্ছিল চোখের সামনে ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে। অন্যান্য ছবির মতো এখানেও অনুরাগ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে। আনুরাগ তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই গ্রামীণ ভারতের টানাপোড়েন, জাতিভিত্তিক নিপীড়ন আর ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়েছেন বাড়তি কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই।

এই চলচ্চিত্রে ভিনিত কুমার সিং ও অনুরাগ একে অপরকে পাল্লা দিয়েছেন। কোথাও পরিচালক অনুরাগকে মনে হচ্ছিল দারুণ কৌশলী, আবার কোথাও এই ছবির প্রাণ হয়ে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন ভিনিত। একদিকে সাধারণ যুবকের সহজ–সরল আবেগ, অন্যদিকে রিংয়ের হার না–মানা যোদ্ধা—দুটি ভূমিকাতেই ভিনিত ছিলেন অনন্য।

একই সঙ্গে বলতে হয় খলনায়ক জিমি শেরগিলের কথাও। সাধারণত নায়কের চরিত্রে অভিনয় করা জিমি এখানে আবির্ভূত হয়েছে নির্মম এক খলনায়ক হিসেবে। অভিনয়ে কোথাও সুর হারাননি তিনি। সুনয়না চরিত্রে নবাগত জয়াও দারুণ অভিনয় করেছেন। অসাধারণ সব অভিনেতার ভিড়ে নিজেকে আলাদাভাবেই চিনিয়েছেন তিনি। এই চরিত্রটির জন্য মানবিকতা ও কোমলতা প্রয়োজন ছিল, সেটিও দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন তিনি।

সাধারণত বিশাল ক্যানভাসে আমরা যে ধরনের স্পোর্টস ড্রামা দেখতে অভ্যস্ত, ‘মুক্কাবাজ’ তেমন নয়। অনুরাগের স্বকীয়তা ও নিজস্ব ঢং এই চলচ্চিত্রকে ভিন্ন এক মাত্রায় উন্নীত করেছে। ছবির পুরোটাজুড়ে বক্সিং থাকলেও এটি শেষ পর্যন্ত খেলার গল্প হয়ে থাকেনি। রিংয়ের টানাপোড়েন ও দ্বন্দ্ব সমানভাবে উপস্থিত ছিল নিত্যকার জীবনেও। এটিই মূলত সিনেমাটিকে অনেক বেশি জীবন্ত করে তুলেছে।

মুক্কাবাজ (২০১৮)

পরিচালক: অনুরাগ কশ্যপ

অভিনয়: ভিনিত কুমার সিং, জয়া হোসাইন, জিমি শেরগিল, রবি কিষান

আইএমডিবি রেটিং: ৮/১০

রানটাইম: ২ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted