গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য, কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকেরা

অস্থিরতা কাটিয়ে খুলেছে বন্ধ কারখানা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

প্রতিনিধি, গাজীপুর

টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ ও অচলাবস্থার পর গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে আবারও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে। ছুটি শেষে আজ রোববার সকাল থেকে পোশাক কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকেরা। শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে বন্ধ থাকা কারখানাগুলোও খুলে দেওয়া হয়েছে। সকাল থেকেই কারখানাগুলোর ফটকে শ্রমিকদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তাঁদের কাজে ফেরায় শিল্পাঞ্চলে আবারও কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

এদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। কোথাও বড় ধরনের যানজট বা শ্রমিক বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

রোববার সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ এলাকাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, শ্রমিকেরা দল বেঁধে কারখানায় প্রবেশ করছেন। কারখানার সামনে শ্রমিকদের স্বাভাবিক উপস্থিতি ছিল। কয়েক দিন আগের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির পরিবর্তে কর্মস্থলে ফিরেছে স্বাভাবিক পরিবেশ।

কারখানার আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার সময় কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

নিরাপত্তায় বিজিবি-পুলিশসহ বিপুলসংখ্যক সদস্য

শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১৩ প্লাটুন বিজিবি, ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, কারখানার আশপাশ এবং মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন। তাঁদের উপস্থিতিতে শ্রমিক ও যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তাঁরা কাজে ফিরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ১৩ প্লাটুন বিজিবি, ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।’

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শ্রমিকদের নিরাপদে কাজে যোগ দেওয়া এবং শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য।

কাজে ফিরতে পেরে স্বস্তিতে শ্রমিকেরা

কর্মস্থলে ফিরে আসা কয়েকজন পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা নিয়মিত কাজ চালিয়ে যেতে চান। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বেতন বাড়ানোর দাবির সঙ্গে তাঁরা একমত।

শ্রমিকদের ভাষ্য, বর্তমান বাজারদরে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় আয় বাড়েনি। ফলে বেতন বাড়ানোর দাবি তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে দাবি আদায়ের জন্য কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখা, ভাঙচুর কিংবা অস্থিরতা তাঁরা চান না। তাঁদের মতে, কাজের পরিবেশ স্বাভাবিক রেখে আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের ন্যায্য দাবি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা উচিত।

শ্রমিকেরা জানান, তাঁরা নিয়মিত কাজে যোগ দিয়ে উৎপাদন চালু রাখতে চান। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়েও কর্তৃপক্ষের আন্তরিক উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন।

কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) আমজাদ হোসাইন বলেন, সকাল থেকেই পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। কারখানাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কারখানাগুলোর কার্যক্রম যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারে, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।

শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের উপস্থিতি এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকায় আপাতত স্বস্তি ফিরেছে। তবে নতুন করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক রয়েছেন।

বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ছড়িয়েছিল অসন্তোষ

বেতন বাড়ানোর দাবিতে গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হয়। একপর্যায়ে তা কয়েকটি শিল্প এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকেরা বিভিন্ন দাবিতে সড়কে অবস্থান নেন। কয়েক দফায় মহাসড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটে।

এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়। যান চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। কর্মস্থলে যেতে ও বাড়ি ফিরতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এতে অনেক শ্রমিক কর্মস্থলে যেতে পারেননি। কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।

অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার পর শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিজিবি, পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

স্থিতিশীল পরিবেশ ধরে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ

কয়েক দিনের অস্থিরতার পর শ্রমিকেরা কাজে ফিরে আসায় গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে স্বস্তি ফিরেছে। তবে এই স্বাভাবিক পরিবেশ কতটা স্থায়ী হয়, তা নির্ভর করবে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া সমাধানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্যোগের ওপর।

শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবি এবং মালিকপক্ষের উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা ও যোগাযোগ বজায় রাখাও জরুরি।

বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। তাঁদের ন্যায্য দাবিগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হলে ভবিষ্যতে অসন্তোষ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

অন্যদিকে, শিল্পকারখানায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা শুধু শ্রমিক বা মালিকপক্ষের দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে প্রশাসন, শিল্প পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

গাজীপুর দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। এখানকার পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে দেশের অর্থনীতি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনা করে শিল্পকারখানায় স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

শ্রমিকেরা কাজে ফিরেছেন, কারখানাও খুলেছে। এখন প্রয়োজন এই স্বাভাবিক পরিবেশ ধরে রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted