বিনোদন ডেস্ক |
প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬
কখনো গানে মাতিয়েছেন, কখনো অভিনয়ে হাসিয়েছেন দর্শককে। কখনো আবার নিজের খামখেয়ালি স্বভাব আর অদ্ভুত সব কাণ্ডে হয়েছেন আলোচনার শীর্ষবিন্দু। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী কিশোর কুমার। তাঁকে কোনো একটি পরিচয়ে বেঁধে রাখা কঠিন। তবে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন তাঁরই কোনো সিনেমার গল্প—যেখানে আছে অদ্ভুত এক ভবিষ্যদ্বাণী, মৃত্যুর আগে ছেলের জন্য অপেক্ষা, আর শেষ মুহূর্তেও রসিকতা করার চিরচেনা স্বভাব।
১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর মাত্র ৫৮ বছর বয়সে মারা যান এই মহান শিল্পী। চিকিৎসকেরা তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদ্রোগের কথা জানান। কিন্তু মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা আজও মানুষের মনে কৌতূহল জাগায়। বিশেষ করে তাঁর ছেলে অমিত কুমারের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে এমন কিছু কথা, যা শুনলে মনে হয়, নিজের মৃত্যুর আঁচ কি আগেই পেয়েছিলেন কিশোর?

ট্যারো কার্ডের সেই ভবিষ্যদ্বাণী
কিশোর কুমারের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল তাঁর মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর আগে। ১৯৮২ সালে আসামে একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে এক ট্যারো কার্ড পাঠকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিশোরের। ছেলের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি কিশোরকে বলেছিলেন, তাঁর হাতে আর মাত্র সাত বছর সময় আছে। কথাটি নিছক ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, নাকি কাকতালীয়—তার উত্তর জানা নেই। তবে আশ্চর্যের বিষয়, ১৯৮৭ সালেই (ভবিষ্যদ্বাণীর প্রায় ৫ বছর পর) চিরবিদায় নেন এই গায়ক। কিশোরের ছেলে অমিত কুমার পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে বাবার মৃত্যুকে ঘিরে এই রহস্যময় গল্পটি নতুন করে প্রকাশ্যে আনেন।
শেষ দিনটিতেও ছেলের অপেক্ষা
মৃত্যুর দিন কিশোর কুমার তাঁর ছেলে অমিত কুমারের ফেরার সময় নিয়ে প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন ছিলেন। সে সময় অমিত কুমার যুক্তরাষ্ট্রের একটি অনুষ্ঠানের সফরে ছিলেন। সফরের শেষ পর্যায়ে অমিত ছিলেন টরন্টোতে। কিশোর তাঁর ছেলেকে সেখান থেকে কিছু ইংরেজি সিনেমার ভিডিও ক্যাসেট কিনে আনতে বলেছিলেন। মৃত্যুর দিন ছেলের বিমান ঠিক সময়ে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে বারবার খোঁজ নিচ্ছিলেন তিনি। পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতিও সেদিন তাঁর আচরণে কিছুটা অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন অমিত।
‘ডাক্তার ডাকলে সত্যিই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে’
কিশোর কুমারের মৃত্যুর সবচেয়ে আলোচিত ও বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটে তাঁর শেষ মুহূর্তের কথোপকথনে। মৃত্যুর দিন তিনি অসুস্থ বোধ করছিলেন, শরীর ভালো লাগছিল না এবং কাঁধেও ব্যথা অনুভব করছিলেন। স্ত্রী লীনা চন্দাভারকর প্রথমে ভেবেছিলেন, কিশোর হয়তো বরাবরের মতো কোনো মজা করছেন। কারণ, মানুষকে হাসানো এবং খামখেয়ালি আচরণে সবাইকে চমকে দেওয়া ছিল তাঁর স্বভাব।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকলে লীনা চিকিৎসক ডাকার কথা ভাবেন। তখন কিশোর রসিকতা করে বলেছিলেন, “ডাক্তার ডাকলে আমার সত্যিই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।” কথাটি ছিল তাঁর পরিচিত রসিকতাপ্রবণ স্বভাবেরই প্রতিফলন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এর পরপরই তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে এবং চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর আগের দিনও স্টুডিওতে গান রেকর্ড
কিশোরের জীবনের শেষ কর্মদিবসটিও ছিল সংগীতে ভরা। ১৯৮৭ সালের ১২ অক্টোবর, মৃত্যুর ঠিক আগের দিন, মুম্বাইয়ের মাহবুব স্টুডিওতে সংগীত পরিচালক বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে ‘গুরু গুরু’ গানটি রেকর্ড করেছিলেন তিনি। গানটি ছিল মিঠুন চক্রবর্তী ও শ্রীদেবী অভিনীত ‘ওয়াক্ত কি আওয়াজ’ ছবির। বাপ্পি লাহিড়ী পরে স্মৃতিচারণায় জানিয়েছিলেন, রেকডিংয়ের সময় কিশোর বরাবরের মতোই হাসিঠাট্টায় মেতে ছিলেন। তাঁর আচরণে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় ছিল না যে, এটিই হতে যাচ্ছে তাঁর জীবনের শেষ গান।
এক অবিনশ্বর কণ্ঠের গল্প
শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রথাগত প্রশিক্ষণ না থাকলেও নিজের কণ্ঠ, গায়কির বৈচিত্র্য ও অভিনব প্রকাশভঙ্গিতে হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন কিশোর কুমার। ‘মেরে স্বপ্নো কি রানি’, ‘রুপ তেরা মস্তানা’, ‘আনেওয়ালা পাল’, ‘ও সাথি রে’ কিংবা ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে’—এমন অসংখ্য অবিনশ্বর গানে তাঁর কণ্ঠ আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে জীবন্ত। দেব আনন্দ, রাজেশ খান্না ও অমিতাভ বচ্চনের মতো তারকাদের পর্দার উপস্থিতিকে তাঁর কণ্ঠ দিয়েছিল আলাদা এক রূপ।
ব্যক্তিজীবনে স্বাধীনচেতা ও আবেগপ্রবণ এই মানুষটি জীবনের শেষ দিকে সংগীতের পরিবর্তিত ধারা নিয়ে কিছুটা অসন্তুষ্ট ছিলেন। নিজের জন্মস্থান মধ্যপ্রদেশের খান্ডোয়ায় ফিরে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছাও ছিল তাঁর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খান্ডোয়ায় আর ফেরা হয়নি, কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে ওপারে পাড়ি জমান এই সুরের জাদুকর।
