মুঠোফোনে ঋণের ভয়ংকর ফাঁদ: অবৈধ ৩১টি অ্যাপে লেনদেন বন্ধের কঠোর নির্দেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের

অর্থনীতি ডেস্ক ।। অনলাইন সংস্করণ
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
ঢাকা: দেশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও মুঠোফোনে চড়া সুদে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেল ও প্রতারণাকারী অননুমোদিত অনলাইন অ্যাপগুলোর বিরুদ্ধে এবার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব অবৈধ ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সব ধরনের আর্থিক লেনদেন অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য দেশের সব তফসিলি ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) যেমন—বিকাশ, রকেট, নগদ এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (পিএসপি) কঠোর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একই সঙ্গে গুগল প্লে স্টোরসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে এসব বিপজ্জনক ও অনুমোদনহীন ঋণদাতা অ্যাপস দ্রুত অপসারণ এবং এদের সেবা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
যেভাবে পাতা হচ্ছে ব্ল্যাকমেলের ভয়ংকর ফাঁদ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট চিঠিতে জানানো হয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় কিছু অননুমোদিত অ্যাপ অতি সহজে ঋণ দেওয়ার টোপ ফেলে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করছে। ঋণ নেওয়ার সময় সাধারণ গ্রাহকদের অজান্তেই অ্যাপগুলো মোবাইলের কনট্যাক্ট লিস্ট, খুদে বার্তা (SMS), গ্যালারির ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিওসহ নানা সংবেদনশীল তথ্যের নিয়ন্ত্রণ (Access) নিয়ে নেয়।
পরবর্তীতে কোনো গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে চড়া সুদের এই ঋণ পরিশোধ করতে সামান্য দেরি করলেই শুরু হয় আসল অত্যাচার। গ্রাহকদের ব্ল্যাকমেল ও হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে কনট্যাক্ট লিস্টে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের কাছে পাঠানো বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চরম মানসিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
আইন লঙ্ঘন করলে ব্যাংক ও এমএফএস-ও অপরাধী!
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইন, ২০২৪’-এর ১৫(২) ধারা উল্লেখ করে স্পষ্ট জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তহবিল সংগ্রহ, ঋণ দেওয়া, কিংবা অর্থ লেনদেন সম্পূর্ণ বেআইনি। এই নিয়ম লঙ্ঘন করে পরিচালিত ঋণ প্রদান কার্যক্রম একই আইনের ৩৭(১) ধারা অনুযায়ী একটি কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অনুমোদিত ব্যাংক বা বিকাশ-নগদের মতো এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো যদি জেনে-না-জেনে এ ধরনের কোনো অবৈধ অ্যাপকে লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ক্যাশ-ইন বা ক্যাশ-আউট সেবা দেয়, তবে সেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অপরাধের সহায়ক চ্যানেল বা ‘সহযোগী অপরাধী’ হিসেবে গণ্য করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চিহ্নিত সেই ভয়ংকর ৩১টি অবৈধ অ্যাপের তালিকা
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ডেটা চুরি, অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অন্তত ৩১টি অবৈধ অ্যাপ চিহ্নিত করেছে। এই অ্যাপগুলো থেকে ঋণ গ্রহণ এবং এদের সাথে যেকোনো লেনদেন থেকে বিরত থাকতে জনগণকে সতর্ক করা হয়েছে। অ্যাপগুলো হলো:
১. সাথী লোন
২. পপক্যাশ
৩. ফিনক্যাশ
৪. কুইক লোন
৫. কুইক টাকা
৬. ঢাকা ফিন
৭. লোনভাইব
৮. দোস্ত লোন
৯. টাকা ক্যাশ লোন
১০. কেওয়নজা লোন
১১. এসএসএইচ মানি
১২. লোনবাডি
১৩. ক্যাশহোরা
১৪. আলো ক্যাশ
১৫. ফাস্ট লোন
১৬. ইজি টাকা
১৭. ধৈর্য লোন
১৮. ফিন ডট ডু
১৯. বঙ্গক্যাশ
২০. আশা লোন
২১. সুবিধা লোন
২২. স্মার্ট লোন বিডি
২৩. অনলাইন লোন বিডি
২৪. সিটি অনলাইন লোন
২৫. বিডি সহজ লোন
২৬. ক্যাশ লোন
২৭. সোনালী
২৮. লোনহাট
২৯. টাকানাও
(নোট: তালিকায় কিছু অ্যাপের ক্লোন বা একই নামের একাধিক সংস্করণ রয়েছে)
সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ
মুঠোফোনে ঋণের এই ভয়ংকর ফাঁদ নিয়ে গণমাধ্যমে বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দেশজুড়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবিলম্বে এই চক্রের বিরুদ্ধে নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে।
image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted