শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ, মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা সরকারের

পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য শ্রমমন্ত্রীর; শ্রমিকদের স্বার্থে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশ্বাস

ডেস্ক রিপোর্ট

তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনকে কেন্দ্র করে চলমান অসন্তোষের পেছনে কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠনের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তাঁর দাবি, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। তবে সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ায় এ ধরনের পরিস্থিতির অবসান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

রোববার (১ নভেম্বর) সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের লক্ষ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে শ্রমমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়টি নিয়ে সরকার সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। আলোচনার পরই রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়া হবে—এ তথ্য গণমাধ্যমের মাধ্যমেও জানানো হয়েছিল। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে এ নিয়ে বিভ্রান্তি বা অসন্তোষ তৈরি হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু এর পরও কয়েকটি কারখানায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিছু কারখানায় অযথা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিকদের কারখানা থেকে ছুটি দিয়ে দেওয়ার পর আবার বলা হচ্ছে, মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে বলে মনে করেন তিনি।

শ্রমিকদের নামে অন্য কেউ পরিস্থিতি অস্থির করছে

সংবাদ সম্মেলনে গত দিনের ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গ তুলে শ্রমমন্ত্রী বলেন, যেসব ব্যক্তি এসব ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাঁরা প্রকৃত শ্রমিক নন। তাঁর ভাষায়, মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন লোক গিয়ে একটি ঘটনা ঘটিয়েছেন। অথচ গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিভিন্ন ফেডারেশনের প্রতিনিধি ও নেতারা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁরা শ্রমিকদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছেন এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমেও শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

মন্ত্রী বলেন, শ্রমিক নেতারা জানিয়েছিলেন, সরকার রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেবে। তাই শ্রমিকদের কারখানায় অবস্থান করার কথা ছিল। সরকারের পক্ষ থেকেও আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না হয়, সে জন্য গণমাধ্যমের মাধ্যমেও তথ্য প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু এর পরও কিছু কারখানায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিকদের কারখানা থেকে ছুটি দিয়ে দেওয়ার পর মজুরি বোর্ড ঘোষণা করা হয়নি বলে প্রচার করা হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে জানান তিনি।

রাজনৈতিক সংগঠনের ইন্ধনের অভিযোগ

শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে রাজনৈতিক সংগঠনের ভূমিকা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শ্রমমন্ত্রী বলেন, তাঁর ধারণা, কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও স্বার্থের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তারপরও যদি কোনো পক্ষ পরিস্থিতি অস্থির করার চেষ্টা করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

শ্রমমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, দেশের সাধারণ মানুষ ও প্রকৃত শ্রমিকরা এসব বিষয় বুঝতে পারবেন। কোনো পক্ষের স্বার্থে যেন শ্রমিকদের ব্যবহার করা না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

তাঁর মতে, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা ও সমাধানের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো ধরনের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শ্রমিকদের স্বার্থের বিষয়টি সামনে রেখে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা, সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান

ঘটনাগুলোর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, কোনো একটি বিষয়কে সামনে রেখে অন্য কোনো গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, কোনো পক্ষ যদি শ্রমিকদের কোনো দাবি বা সমস্যাকে ব্যবহার করে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে সেটি শ্রমিকদের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই কোনো ধরনের উসকানিতে প্রভাবিত না হয়ে প্রকৃত ঘটনা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

শ্রমমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের জনগণ, শ্রমিক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা সচেতন থাকলে এ ধরনের উদ্দেশ্য সফল হবে না। কোনো ঘটনা ঘটলে তার প্রকৃত কারণ যাচাই করা এবং সঠিক তথ্য জানা জরুরি। ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণার কারণে যেন পরিস্থিতি আরও খারাপ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি মনে করেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকা দরকার। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হলে সেটিই হবে সবচেয়ে ভালো পথ।

মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা জানতে চান, দিনের ঘটনাগুলোর পর সরকার কঠোর অবস্থান নেবে কি না। জবাবে শ্রমমন্ত্রী বলেন, তাঁর আশা, মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পর এ ধরনের পরিস্থিতি আর থাকবে না।

তিনি বলেন, সরকার শ্রমিকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে শ্রমিকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবির বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে এ নিয়ে আর কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা অস্থিরতা থাকার কথা নয়।

মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা শ্রমিকদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

শ্রমমন্ত্রী বলেন, সরকার চায় শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করুন। শিল্পকারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম বজায় থাকুক। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য স্বার্থও রক্ষা করা হোক। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

শ্রমিকদের দাবি ও শিল্পের স্থিতিশীলতা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ

তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ শিল্পের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাও জরুরি।

মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকে না; শিল্পের সামগ্রিক পরিবেশেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে শ্রমিকদের দাবি ও উদ্বেগ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শ্রমমন্ত্রীর বক্তব্যে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, কিছু রাজনৈতিক সংগঠন এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর কোনো বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়টি শ্রমমন্ত্রীর বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হবে।

আলোচনার পথেই সমাধানের প্রত্যাশা

শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের দাবি, মালিকপক্ষের অবস্থান এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো প্রয়োজন।

শ্রমমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার ইতোমধ্যে শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘোষণার পর শ্রমিকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে এবং চলমান অসন্তোষ কমে আসবে বলে তিনি আশা করছেন।

তিনি আবারও বলেন, শ্রমিকদের প্রকৃত স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। একই সঙ্গে কোনো গোষ্ঠী যেন নিজেদের স্বার্থে শ্রমিকদের ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

সব মিলিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন শ্রমমন্ত্রী। তাঁর প্রত্যাশা, মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণার পর শ্রমিকদের মধ্যে থাকা অসন্তোষ দূর হবে এবং কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরে আসবে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পর এ ধরনের পরিস্থিতি আর থাকবে না, ইনশাআল্লাহ।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted