সৌদি–হুতি সংঘাত ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা, সতর্ক যুক্তরাষ্ট্র

ডেস্ক রিপোর্ট :

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়েছে। এরই মধ্যে পরিস্থিতি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ সতর্কতা জারি করে। একই ধরনের সতর্কবার্তা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো থেকেও দেওয়া হয়েছে। সতর্কতার আওতায় রয়েছে ইসরায়েল, লেবানন, জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান।

মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলেছে, সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত দ্রুত আরও বড় আকার নিতে পারে। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন নাগরিকদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে এবং সম্ভাব্য বিমান চলাচল বন্ধ, ফ্লাইট বাতিল ও অন্যান্য ভ্রমণ বিঘ্নের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের হামলা সৌদি আরবের আরও ভেতরের এলাকাগুলো পর্যন্ত পৌঁছেছে। শনিবার রিয়াদ লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা নিশ্চিত করেছে সৌদি আরব। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করা হয়েছে। একই সময়ে দেশটির আরও কয়েকটি এলাকায় হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

শনিবার সৌদি রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। হুতিদের ভাষ্য, তারা রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদমুখী একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। রাজধানীর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি বিস্ফোরণ ও ধোঁয়া দেখা যায়। তবে হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে সৌদি পক্ষ জানিয়েছে।

হুতিদের হামলার কারণে রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে।

এ হামলার পরই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, সৌদি আরবকে ঘিরে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের সতর্কতা

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সতর্কবার্তায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিমান চলাচলে হঠাৎ পরিবর্তন আসতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফ্লাইট বাতিল হতে পারে, আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যেতে পারে কিংবা ভ্রমণপথে আকস্মিক পরিবর্তন আসতে পারে।

এ কারণে মার্কিন নাগরিকদের বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা শুধু সৌদি আরব বা ইয়েমেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন নাগরিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সৌদি আরব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলাদা ভ্রমণ সতর্কতাও রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ১৫ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের জন্য ‘লেভেল ৩—রিভিচার ট্রাভেল’ বা ভ্রমণ পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে।

সংঘাতের কেন্দ্র ইয়েমেন

সৌদি আরব ও হুতিদের বর্তমান সংঘাতের মূল কেন্দ্র ইয়েমেন। দেশটির রাজধানী সানা দখলের পর ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে।

এরপর কয়েক বছর ধরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত চলে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনে সহিংসতা তুলনামূলকভাবে কমে আসে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়েছে। হুতিরা ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে এবং লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী কৌশলগত এলাকাগুলোর দিকে অগ্রসর হয়েছে।

সাম্প্রতিক লড়াইয়ে মোখা বন্দরনগরী ও বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছের পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখন শুধু দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে লোহিত সাগর, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথেও।

বাব আল-মানদেব নিয়ে উদ্বেগ

লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা বাব আল-মানদেব প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।

হুতিদের নিয়ন্ত্রণ পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় বাড়তে থাকায় এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।

বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মানদেব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পারস্য উপসাগর থেকে সরাসরি হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে তেল পাঠানোর ক্ষেত্রে সৌদির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ও লোহিত সাগরীয় নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সাম্প্রতিক হামলার কারণে এই জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে পড়েছে। সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করার কথা জানিয়েছে। এর আগে ওই পাইপলাইনে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। সৌদি কর্তৃপক্ষ এ হামলার জন্য ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের দায়ী করেছে।

সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোও ঝুঁকিতে

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় হামলা হলে শুধু সৌদি অর্থনীতিই নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সাম্প্রতিক সংঘাতে সৌদির তেল স্থাপনা ও রপ্তানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। ইয়ানবু বন্দরও হুতিদের হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের অগ্রযাত্রা ও হামলার কারণে সৌদি তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা বাড়ছে।

বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হলে এর প্রভাব পরিবহন, শিল্প ও বিভিন্ন দেশের ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে। তবে পরিস্থিতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে এর প্রকৃত প্রভাব কী হবে, তা নির্ভর করছে সংঘাতের পরবর্তী গতিপথের ওপর।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহায়তার আবেদন

হুতিদের ধারাবাহিক হামলার মুখে সৌদি আরব মিত্র দেশগুলোর কাছে সহায়তা চেয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষ করে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ায় দেশটি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরসহ কয়েকটি দেশের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ সৌদি আরবকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রও এখন পর্যন্ত সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের পক্ষে যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং গোয়েন্দা তথ্যসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।

সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি যুক্তরাষ্ট্র?

সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলা বাড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালাবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইয়েমেনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এর মধ্যেই ট্রাম্প নির্ধারিত সময়ের আগেই ক্যাম্প ডেভিড থেকে ওয়াশিংটনে ফিরে এসেছেন। তাঁর আগাম ফেরার কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে এর আগে বলা হয়েছিল, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের জন্য ট্রাম্পের কাছে অনুরোধ করেছিলেন। তবে তখন মার্কিন প্রশাসন সরাসরি হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

এখন রিয়াদে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পরিস্থিতি বদলেছে কি না, তা নিয়ে নজর রয়েছে।

ক্যাম্প ডেভিড থেকে আগাম ফেরায় জল্পনা

ট্রাম্পের ক্যাম্প ডেভিড সফর সংক্ষিপ্ত করে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর আগাম ফেরাকে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করেনি।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়াবে কি না, এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন সতর্কতা জারির ঘটনা পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের মাত্রা বোঝাচ্ছে।

ইরানকে ঘিরেও উদ্বেগ

হুতি বিদ্রোহীদের ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব হুতিদের সামরিক সক্ষমতার পেছনে ইরানের সহযোগিতার অভিযোগ করে আসছে। ইরান অবশ্য হুতিদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ অস্বীকার করে।

বর্তমান সংঘাতের কারণে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান বৃহত্তর সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হুতিদের হামলা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে ইয়েমেনের পরিস্থিতি এখন আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার।

যদি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ শহর, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও বন্দরগুলোতে হামলা বাড়ে, তাহলে রিয়াদ আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। একইভাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থানে হামলা বাড়ালে হুতিরাও পাল্টা হামলা চালাতে পারে।

এ ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকলে ইয়েমেনের বাইরেও সংঘাতের প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তার মূল উদ্বেগও এখানেই। ওয়াশিংটন বলেছে, সামরিক সংঘাত দ্রুত আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বিমান চলাচল ও আকাশপথে হঠাৎ পরিবর্তনের আশঙ্কার কথাও জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের আরেকটি বড় দিক হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য।

বাব আল-মানদেব প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়। এই নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে জাহাজ চলাচলের খরচ ও সময় দুটোই বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।

ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো এবং লোহিত সাগরের নৌপথে আরও হামলা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

ইয়েমেনে বাড়ছে মানবিক সংকট

সামরিক সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের কারণে লাখ লাখ মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে রয়েছে। নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘও ইয়েমেনে মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তত বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

২০১৪ থেকে শুরু সংকট

ইয়েমেনের বর্তমান সংকটের শিকড় ২০১৪ সালে। ওই বছর হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এরপর দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়।

২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে। এর পর থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয়।

কয়েক বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে ইয়েমেনের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। কিন্তু চলতি বছরে আবার সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে।

এবারের লড়াইয়ে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বিস্তার নতুন করে আঞ্চলিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সামনে কী হতে পারে

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে বর্তমান সংঘাত কোন দিকে যাবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

একদিকে সৌদি আরব তার সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় সামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডে হামলা অব্যাহত রাখার সক্ষমতা দেখাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত সরাসরি হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে রিয়াদে নতুন হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন নিরাপত্তা সতর্কতা জারির পর পরিস্থিতি আরও নজরদারির মধ্যে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত যদি শুধু ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকবে। কিন্তু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো শক্তি সরাসরি জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

এ মুহূর্তে তাই সবার নজর সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপ, হুতিদের হামলার ধরন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের দিকে।

সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের নতুন সংঘাত শুধু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে নতুন করে সামনে আনেনি; বরং লোহিত সাগরের নৌপথ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে কি না, নাকি কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব হবে—আগামী কয়েক দিনেই তার কিছুটা স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted