সর্বশেষ ইশরাকের পদত্যাগ; অপরাধ বা শৃঙ্খলা ভঙ্গে কাউকেই ছাড় নয়—প্রধানমন্ত্রীর কড়া অবস্থান
রাজনৈতিক প্রতিবেদক: বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র আট মাসের মাথায় মন্ত্রিসভার তিনজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য (মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী) এবং সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যের বিদায় ঘটেছে। বিদায়ী নেতাদের কেউ কেউ আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে শারীরিক অসুস্থতা বা স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার কথা বললেও, রাজনৈতিক অঙ্গনে একে দেখা হচ্ছে সরকার ও দলের ভেতরে কঠোর শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের অংশ হিসেবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো উদ্যোগ বা কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—অপরাধ বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রশ্নে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না, তিনি যতই প্রভাবশালী বা আস্থাভাজন হোন না কেন।
অস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান: পদত্যাগ করতে হলো ইশরাককে
সর্বশেষ গতকাল সোমবার (১৯ অক্টোবর) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক হোসেন। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় নিজের লাইসেন্সকৃত অস্ত্র হাতে সহযোগীদের নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন তিনি। সেই অস্ত্র উঁচানো অভিযানের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিলে সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
একে একে বিদায় নিলেন যারা:
- দীপেন দেওয়ান (পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী): সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন পদত্যাগ করেন তিনি। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি ‘শারীরিক অসুস্থতা’ ও মন্ত্রণালয়ের কাজের গতিশীলতা বজায় রাখার কথা উল্লেখ করে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
- জহির উদ্দিন স্বপন (তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী): গত ২২ আগস্ট তিনি তথ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে একই দিন তাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান আন্দালিব রহমান পার্থ।
- ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি (সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি): রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। গত ১ অক্টোবর তিনি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।
‘জনগণের সরকারে ছাড় নেই’—প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র
সরকারের এই কঠোর ও আপসহীন অবস্থান নিয়ে সোমবার রাতে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি স্পষ্ট বার্তায় লেখেন, “জনগণের সরকারের বার্তা এখানে অনেকটাই স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আস্থাভাজন, ত্যাগী ও জনপ্রিয় একজন তরুণ নেতার সাহসী ও জনবান্ধব উদ্যোগের বাস্তবায়নেও যদি কোনো বিতর্কের অবকাশ থাকে, সেখানেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথযাত্রায় সামনের দিনগুলোতেও, সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে দায়বদ্ধতার ধারা বজায় থাকবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবনা
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অতীতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির কম থাকলেও, বর্তমান প্রশাসন একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে চাইছে। আট মাসে চারজন গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ মূলত প্রশাসন ও দলের সর্বস্তরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও নিয়মতান্ত্রিক বার্তা তৈরি করবে।
