
ডেস্ক রিপোর্ট
ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের অগ্রগতি এবং দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আরও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রত্যাশা করছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের এ প্রত্যাশার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বুধবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি জানান, বৈঠকে ঋণ ব্যবস্থাপনা, মার্কিন সহায়তা এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক (এক্সিম ব্যাংক) এবং দেশটির সহায়তাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন তাঁরা।
অর্থমন্ত্রীর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এগিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগও বাড়ছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ, তেল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী আমদানি করছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সহায়তা দেওয়া উচিত বলে মনে করে সরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাড়তি সহায়তার প্রত্যাশা
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ অতীতে প্রত্যাশা অনুযায়ী সহায়তা পায়নি বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য, দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি এবং বাণিজ্যিক লেনদেন বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এখন বাংলাদেশের আরও সহায়তা পাওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘বিগত দিনে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পাইনি। কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে; আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেকগুলো এয়ারক্রাফট কিনছি, তেল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য ও কমোডিটি আমদানি করছি। তাই তাদের কাছ থেকে আমাদের জন্য বাড়তি সহায়তা আসা উচিত। তারা এ বিষয়ে একমত হয়েছে। এখন দেখা যাক।’
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের যে অগ্রগতি হয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশের এ অবস্থানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একমত হয়েছে। তবে কী পরিমাণ সহায়তা পাওয়া যাবে এবং তা কোন প্রক্রিয়ায় আসবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কিছু জানানো হয়নি।
ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা
সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে বড় ধরনের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বিনিয়োগকে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এবং যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করতে চায় সরকার।
তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক নীতির মূল জোর হচ্ছে বিনিয়োগ। আমরা ঋণ থেকে সরে এসে সরাসরি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগের দিকে বেশি যেতে চাই।’
অর্থমন্ত্রীর মতে, বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
ঋণ ও বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ঋণ গ্রহণ করলে তা নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী সুদসহ পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকল্প বা ব্যবসায় মূলধন বিনিয়োগ করতে পারে। যৌথ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি পক্ষ একসঙ্গে কোনো উদ্যোগে অংশ নেয়।
সরকারের পরিকল্পনা হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ক্ষেত্রে শুধু ঋণের ওপর নির্ভর না করে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির দেশের সঙ্গে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে এবং বাংলাদেশ এ পথে এগিয়ে যেতে পারবে বলে তিনি আশাবাদী।
যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিম ব্যাংক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থায়নে ভূমিকা রাখে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে বৈঠকে কী ধরনের অর্থায়ন, বিনিয়োগ বা সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেননি অর্থমন্ত্রী। ফলে এসব আলোচনা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগ বা আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আমদানি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করে। এর মধ্যে উড়োজাহাজ, জ্বালানি তেল ও সয়াবিনের মতো পণ্য রয়েছে। এসব আমদানির মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য কেনা হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্কও আগের তুলনায় এগিয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সহায়তা করা উচিত।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তাদের জোর দিয়ে বলেছি, বাংলাদেশ যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এত বেশি আমদানি করছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, এখন যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই সমর্থন না আসে, তাহলে আর কবে আসবে? আমরা যে সহায়তাগুলো আশা করছি, সেগুলো এখন আসা উচিত।’
এ বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহায়তার বিষয়টিও সামনে এনেছেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রত্যাশা, বাণিজ্যিক সম্পর্কের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাড়তি অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাওয়া যাবে। তবে এ সহযোগিতার ধরন, পরিমাণ ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আলোচনার ফলাফলের দিকে নজর
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে আলোচনায় একমত হওয়া এবং বাস্তবে সহায়তা পাওয়া এক বিষয় নয়। তাই এসব আলোচনা শেষ পর্যন্ত কী ফল বয়ে আনে, তা দেখার বিষয়।
সরকারের লক্ষ্য, ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও কার্যকর করা। এ ক্ষেত্রে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ঋণ ব্যবস্থাপনা, মার্কিন সহায়তা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন এসব আলোচনার ভিত্তিতে কোনো বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রত্যাশার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একমত হয়েছে। তবে কীভাবে এবং কতটা সহায়তা পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত হতে আরও সময় লাগবে।
