আলবার্টার বাসিন্দাদের ‘না’: কানাডাতেই থাকছে তেলসমৃদ্ধ প্রদেশটি ট্রাম্পের উসকানি ও বাণিজ্যযুদ্ধের মুখেই জাতীয় ঐক্যের বড় জয়

অনলাইন ডেস্ক: কানাডার তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশটি দেশটির সঙ্গে থাকবে নাকি আলাদা হয়ে যাবে—এই প্রশ্নে আয়োজিত ঐতিহাসিক আগাম গণভোটে স্বাধীনতার প্রস্তাবকে বিপুল ভোটে প্রত্যাখ্যান করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত এই ভোটে আলবার্টার সিংহভাগ মানুষ জানিয়ে দিয়েছেন, কানাডা ভেঙে নতুন কোনো রাষ্ট্র গড়ার প্রয়োজন নেই। তাঁরা কানাডার সঙ্গেই আছেন এবং থাকবেন। 
ভোটের অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় ৭৬ থেকে ৭৭ শতাংশ মানুষ কানাডার পক্ষে রায় দিয়েছেন। অন্যদিকে মাত্র ২৩ থেকে ২৪ শতাংশ বাসিন্দা আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে ভোট দেন। 
প্রধানমন্ত্রীর স্বস্তি ও ব্রেক্সিটের সতর্কতা
ফলাফল প্রকাশের পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আলবার্টার মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বাসিন্দারা তাঁদের ‘পরিষ্কার পছন্দের’ কথা জানিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা ঐক্য ও কানাডাকেই বেছে নিয়েছেন। 
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজে আলবার্টায় বড় হয়েছেন এবং গত বছর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রদেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করছেন। প্রচারণার শেষ সময়ে তিনি আলবার্টাবাসীকে সতর্ক করে বলেছিলেন, স্বাধীনতার এই চেষ্টা হবে একটি ‘বিপজ্জনক ভাঁওতাবাজি’। ব্রিটেনের ‘ব্রেক্সিট’ গণভোটের সময় ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা টেনে তিনি জানান, ব্রেক্সিটের কারণে ব্রিটিশ অর্থনীতি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, আলবার্টার ক্ষেত্রেও তেমন মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটতে পারত। 
ট্রাম্পের উসকানি ও অর্নেক্সেশনের হুমকি
এমন এক সংবেদনশীল সময়ে এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল, যখন প্রতিবেশী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমাগত কানাডার বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত (অ্যানেক্সেশন) করার হুমকি দিচ্ছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনকি কানাডাকে আমেরিকার ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর হুমকিও দিয়েছেন। 
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই সময়টিকে ভোট আয়োজনের জন্য ‘সবচেয়ে খারাপ সময়’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, মার্কিন হুমকির মুখে এখন জাতীয় পর্যায়ের স্থিতিশীলতা ও একতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। 
শুধু ট্রাম্পই নন, আলবার্টার এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে পর্দার আড়াল থেকে উসকে দিয়েছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আলবার্টাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ বলে অভিহিত করেছিলেন। অন্যদিকে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) সরাসরি লিখেছিলেন, আলবার্টার ‘আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত’। এমনকি আলবার্টার স্বাধীনতাকামী নেতারা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা এবং রিপাবলিকান দলের রাজনৈতিক কৌশলী ও অপারেটিভদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছিলেন বলেও কানাডীয় গণমাধ্যমে খবর এসেছে। 
ক্ষোভের উৎস যেখানে
আলবার্টায় বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে। আলবার্টার বর্তমান প্রিমিয়ার (প্রাদেশিক প্রধান) ড্যানিয়েল স্মিথের অভিযোগ, কার্নির পূর্বসূরি জাস্টিন ট্রুডো নিজের জলবায়ু নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আলবার্টার তেল উৎপাদন বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন, যা বাসিন্দাদের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তবে ড্যানিয়েল স্মিথ নিজে স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে, এবার কানাডার পক্ষে রায় আসায় আলাদা হওয়ার বিতর্ক চিরতরে বন্ধ হওয়া উচিত। 
আশা ছাড়ছেন না স্বাধীনতাপন্থীরা
স্বাধীনতাপন্থী সংগঠন ‘আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্ট’-এর প্রধান মিচ সিলভেস্টার ভোটে হেরে গেলেও আশাবাদী। প্রাদেশিক রাজধানী এডমন্টনের একটি রেস্তোরাঁয় সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা এই প্রদেশে স্বাধীনতার যে চেতনা জাগিয়ে তুলেছি, তা কোথাও চলে যাচ্ছে না।” 
তবে জাতীয় ঐক্যের পক্ষে প্রচার চালানো ‘ফরএভার কানাডিয়ান’ সংগঠনের প্রধান টমাস লুকাশুক বলেন, “কানাডিয়ানদের মধ্যে যে দৃঢ়তা দেখেছি, তা সত্যিই অসাধারণ। এই ফলাফল ট্রাম্পকে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে—কানাডা বিক্রির জন্য নয়।
image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted