ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে যে বার্তা দিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ।। অনলাইন সংস্করণ

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
স্ট্রাসবুর্গ, ফ্রান্স: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরোক্ষভাবে তীব্র খোঁচা দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আটলান্টিকের দুই পাড়ের এই মেলবন্ধন কোনো নতুন ভূরাজনৈতিক সামরিক জোট গঠনের প্রচেষ্টা নয়; বরং দুই পক্ষের অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সুরক্ষায় সক্ষমতা বাড়ানোর এক সময়োপযোগী উদ্যোগ।
বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া এক ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী কার্নি এই বার্তা দেন।
একক দেশের বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ
ভাষণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি এমন কোনো তৃতীয় শক্তি বা জোট গঠনের প্রস্তাব করছেন না, যার মূল লক্ষ্য হবে অন্য কোনো বৃহৎ পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা। তবে কানাডা এমন একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চায়, যাতে কোনো একক দেশ তাদের উন্মুক্ত বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে না পারে কিংবা স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার ধৃষ্টতা দেখাতে না পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘কোনো একক দেশ’ বলতে কার্নি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রীর এই কড়া বক্তব্যের ঠিক একদিন আগে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন কানাডাকে ইইউর ইতিহাসের প্রথম ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ বা সহযোগী সদস্য করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দেন।
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি ও কার্নির পাল্টা জবাব
কানাডাকে ইউরোপের সহযোগী সদস্য করার এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই উদ্যোগকে ওয়াশিংটন যদি কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘শত্রুতাপূর্ণ’ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে, তবে ইউরোপের ওপর অত্যন্ত ‘কঠোর’ শুল্ক আরোপ করা হবে। এমনকি ইউরোপের সাথে বড় ধরনের বাণিজ্য কমিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন ট্রাম্প।
তবে ট্রাম্পের নাম সরাসরি মুখে না এনে কার্নি তার ভাষণে বলেন, “কানাডা কোনো দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে জোট গড়তে চায় না। তবে ইউরোপ ও কানাডা একসঙ্গে কাজ করলে নিজেদের অর্থনীতি ও সমাজকে বাইরের যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চাপের বিরুদ্ধে আরও স্থিতিশীল ও শক্তিশালী করা সম্ভব।” তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “ইউরোপ ও কানাডা একসঙ্গে আরও শক্তিশালী।”
সহযোগিতার ক্ষেত্র: খনিজ সম্পদ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তার ভাষণে শুধু রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং দুই অঞ্চলের সহযোগিতার সম্ভাব্য কয়েকটি মেগা ক্ষেত্রও তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে:
  • জ্বালানি নিরাপত্তা ও খনিজ: ইউরোপকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও হাইড্রোজেন সরবরাহে কানাডার সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার।
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কানাডা ও ইউরোপ যৌথভাবে বৈশ্বিক নীতিমালা তৈরি করবে।
  • শিক্ষা ও প্রযুক্তি: কানাডাকে ইইউর শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ‘ইরাসমাস প্লাস’ ও ‘হরাইজন’-এ যুক্ত করার আগ্রহ।
  • প্রতিরক্ষা ও অর্থায়ন: যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক লেনদেন সহজতর করা।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার বিষয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্য দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম চাপ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে অটোয়া নিজেদের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
ইইউর বিদ্যমান চুক্তিতে ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ নামে কোনো আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ না থাকায় এই সম্পর্কের আইনি কাঠামো কেমন হবে—তা নিয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট আলোচনা চলছে। তবে কানাডার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অক্টোবরে মন্ট্রিয়েলে অনুষ্ঠেয় ‘কানাডা-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে’ এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ও চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারিত হবে।
image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted